মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প © টিডিসি সম্পাদিত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধে যে পক্ষ জয়ী হয়, লুটের মালও তারই প্রাপ্য। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথাও বলেছেন তিনি। ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন ট্রাম্প।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ভাষণে ট্রাম্প ওই সামরিক অভিযান ও তেলচুক্তির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র টানেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে যে বিজয়ী, লুটের মালামাল সেই পাবে, এটাই নিয়ম। সে কথা তো আপনারা জানেন, তাই না?’
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে ধরলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল এখন তাদের হাতে।
ভাষণে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। এ প্রসঙ্গে ইরানের উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, ‘আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করব, নাকি ইসলামিক রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন করে দেব।’
ইরানকে এমনভাবে নরকে পাঠানোর কথাও বলেন ট্রাম্প, যাতে দেশটির টিকে থাকা বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো আশা না থাকে।
জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের এমন হুমকি অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালে সাধারণ পরিষদে দেওয়া তার প্রথম ভাষণে উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। এবার ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকির মাধ্যমে শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে নিজের অবস্থান আবারও তুলে ধরলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
অবশ্য ২০১৭ সালের ওই ভাষণেই ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো দেশের ওপর নিজের জীবনধারা চাপিয়ে দিতে চায় না। শক্তিশালী, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পাশাপাশি কাজ করবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা সামরিক শক্তির বদলে আলোচনা, মধ্যস্থতা ও সম্মিলিত নিরাপত্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ মেটানোর ওপর গুরুত্ব দেয়।
আরও দেখুন: শ্রম মন্ত্রণালয়ে ১৫ পদে নিয়োগ, আবেদন করা যাবে এসএসসি পাসেও
জাতিসংঘ সনদে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর দুটি স্বীকৃত ব্যতিক্রম হলো নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন এবং সশস্ত্র হামলার মুখে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক আত্মরক্ষা।
ভেনেজুয়েলা বা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এসব পদক্ষেপকে তাৎক্ষণিক সশস্ত্র হামলার জবাবে সীমিত আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবেও ট্রাম্প উপস্থাপন করেননি। বরং জাতীয় স্বার্থ, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হুমকি ও বিজয়ের পর অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়টি তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।
জাতিসংঘে দেওয়া এবারের ভাষণে ট্রাম্প সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে বলেন, পশ্চিম গোলার্ধের পাশাপাশি আমাদের অঞ্চল এবং সারা বিশ্বে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।
ভাষণে বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন উদ্যোগের সমালোচনাও করেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আমেরিকাবিরোধী আখ্যা দিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে আদালতটি ত্যাগ করার আহ্বান জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জাতিসংঘের কোনো অঙ্গ নয়; রোম সংবিধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান।
জাতিসংঘভিত্তিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি ট্রাম্পের সমালোচনা নতুন নয়। তবে এবারের ভাষণে যুদ্ধ, সামরিক শক্তি এবং বিজয়ের পর সম্পদ পাওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।