প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
শেয়ারবাজারের ইতিহাসে অনেক বড় বড় সফল কোম্পানির দেখা মিললেও, বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া’র (Nvidia) উত্থানটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নজির সৃষ্টি করেছে। মাত্র পাঁচ বছর আগেও যে প্রতিষ্ঠানটিকে কেবলমাত্র উচ্চমানের গেমিং গ্রাফিক্স কার্ড নির্মাতা হিসেবে চেনা হতো, আজ তারা বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা জেনারেটিভ এআই-এর মূল কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই রূপান্তরটি ঘটেছে অবিশ্বাস্যরকমের দ্রুত গতিতে। ৫ বছরে প্রায় ১,৫০০% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এনভিডিয়া তার বাজারমূল্যে যুক্ত করেছে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। খবর ইয়াহো ফাইন্যান্সের
জানা গেছে, বর্তমানে কোম্পানির আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। এর বিপরীতে বৈশ্বিক অন্য প্রযুক্তি জায়ান্টদের মধ্যে অ্যালফাবেটের বাজারমূল্য ৪.৭৬ ট্রিলিয়ন, অ্যাপলের ৪.৩৫ ট্রিলিয়ন, মাইক্রোসফটের ২.৯৯ ট্রিলিয়ন এবং অ্যামাজনের বাজারমূল্য ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির বাজারমূল্য এবং কোনো দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) হুবহু এক বিষয় নয়। তবে এই তুলনাটি স্পষ্ট করে যে, এনভিডিয়া কতটা দানবীয় আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে এনভিডিয়া কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৩০.৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং চীন (১৯.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) বাদে পৃথিবীর যেকোনো একক দেশের বার্ষিক জিডিপির চেয়েও বেশি মূল্যবান। এটি জার্মানির ৫.০১ ট্রিলিয়ন, জাপানের ৪.৩৪ ট্রিলিয়ন, যুক্তরাজ্যের ৪.০০ ট্রিলিয়ন, ভারতের ৩.৯২ ট্রিলিয়ন এবং ফ্রান্সের ৩.৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপিকে অনায়াসে ছাড়িয়ে গেছে। সম্পদ হিসেবে বর্তমানে স্বর্ণের (আনুমানিক ৩২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্পদ বা অ্যাসেট হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে এনভিডিয়া, যা রূপার (৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলার) চেয়েও অনেক বেশি।
কোনো আকস্মিক ভাগ্যের জোরে নয়, বরং জেনারেটিভ এআই বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM), রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় গাড়ির মতো প্রযুক্তির ডাটা সেন্টার পরিচালনায় এনভিডিয়ার জিপিইউ (GPU) অপরিহার্য হয়ে ওঠায় এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি এসেছে। সহজ কথায়, এআই-এর এই স্বর্ণযুগ বা ‘গোল্ড রাশ’-এ এনভিডিয়া মূলত কোদাল ও কুড়াল বিক্রেতার ভূমিকা পালন করছে। গত অর্থ বছরে কোম্পানিটি প্রায় ২১৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব এবং ৯৬.৬ বিলিয়ন ডলার ফ্রি ক্যাশ ফ্লো (FCF) তৈরি করেছে। ওয়াল স্ট্রিটের ধারণা, আগামী দুই বছরে কোম্পানিটি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ফ্রি ক্যাশ ফ্লো উৎপাদন করবে, যা কর্পোরেট ইতিহাসে বিরল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মার্কিন সরকারের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এআই বাজারে পূর্ণ প্রবেশাধিকার না পেয়েও এনভিডিয়া এই উচ্চতায় পৌঁছেছে। নিষেধাজ্ঞা জোরালো হওয়ার আগে এনভিডিয়ার ডাটা সেন্টারের ২০% থেকে ২৫% সুযোগ আসত চীন থেকে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সংক্রান্ত এক সফরে অন্যান্য প্রযুক্তি নির্বাহীদের সাথে যোগ দিয়েছেন এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং। বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই সফর পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ যদি কোনো নতুন বাণিজ্য বা রপ্তানি কাঠামোর মাধ্যমে চীনের এআই বাজারের একটি অংশও এনভিডিয়ার জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয়, তবে কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধির পথ আরও দীর্ঘায়িত হবে।
অভাবনীয় এই সাফল্যের মাঝেও বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু ঝুঁকি থেকে যায়। এনভিডিয়ার বর্তমান মূল্যায়ন বা ভ্যালুয়েশন এতটাই উচ্চে অবস্থান করছে যে, এটি ধরে রাখতে হলে তাদের আগামী বহু বছর ধরে এআই বাজারে একক আধিপত্য বজায় রাখতে হবে। তবে বর্তমানে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এবং অ্যালফাবেটের মতো ক্লাউড জায়ান্টরা তাদের নিজস্ব কাস্টম এআই চিপ তৈরি করছে, যা এনভিডিয়াকে প্রতিযোগিতার মুখে ফেলবে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ বাজারের চড়াই-উতরাইয়ের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা দ্রুত সম্প্রসারণের পর সাধারণত কিছুটা ঠাণ্ডা বা ঝিমিয়ে পড়ে।
একটি গেমিং চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র আধ দশকে ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের এআই টাইটানে পরিণত হওয়া আধুনিক পুঁজি বাজারের ইতিহাসে অন্যতম সেরা কর্পোরেট রূপান্তর হিসেবে লেখা থাকবে। এনভিডিয়া এখন কেবল একটি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি নয়, এটি বিশ্ব পুঁজি বাজার ও এআই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন মূল প্রশ্ন এটি নয় যে এনভিডিয়া পৃথিবী বদলেছে কি না—কারণ তা তারা ইতোমধ্যেই করে দেখিয়েছে; আসল প্রশ্ন হলো, কোম্পানিটি তার এই অবিশ্বাস্য ভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়নকে জাস্টিফাই করার মতো গতিতে সামনেও এগিয়ে যেতে পারবে কি না।