যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড
লিমন ও বৃষ্টি © টিডিসি সম্পাদিত
যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ঘটনার ১৫ দিন আগেই অভিযুক্ত হিশামের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন লিমন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আবাসন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি আবাসন ব্যবস্থাপনার গাফিলতির বিচার দাবি করেছে নিহতদের পরিবার।
সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে পরিবার জানায়, হিশাম সালেহ আবুগারবিয়ার আচরণ নিয়ে আগে থেকেই গুরুতর উদ্বেগ ছিল। নিহত জামিল লিমনের ভাইয়ের দাবি, ‘হত্যাকাণ্ডের ১৫ দিন আগেই হিশামের চরম রাগী ও উগ্র মেজাজ নিয়ে ‘অ্যাভালন হাইটস’ হাউজিং ম্যানেজমেন্টের কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
পরিবার আরও জানায়, লিমন ও তার রুমমেটের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল না। হিশামের অসামাজিক ও অপ্রীতিকর আচরণ সম্পর্কে লিমন আগেই পরিবার ও বন্ধুদের অবহিত করেছিলেন এবং আরেক ভারতীয় রুমমেটকে সঙ্গে নিয়ে আবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জমা দিয়েছিলেন।
লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আমার ভাই সবসময় বলত ওর রুমমেট অসামাজিক ও রুক্ষ স্বভাবের, সে কিছুটা সাইকোপ্যাথ। তারা অভিযোগ জানালেও কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি আরও যোগ করেন, যথাযথ ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা অতীত ইতিহাস যাচাই না করেই লিমনের সাথে হিশামকে রুমমেট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল আবাসন কর্তৃপক্ষ।’
নিহতদের পরিবার ইউনিভার্সিটির কাছে ‘অ্যাভালন হাইটস’ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ‘কেন একজন রুমমেট দেওয়ার আগে তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা হলো না? অভিযোগ পাওয়ার পরও কেন তাকে দ্রুত সরানো হলো না? পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ক্যামেরা ও প্রহরীর ব্যবস্থা কেন ছিল না?’
এই ঘটনায় ২৬ বছর বয়সী হিশাম সালেহ আবুগারবিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস। মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক লোগান মারফি তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রিট্রিয়াল ডিটেনশন শুনানিতে অভিযুক্ত উপস্থিত না থাকলেও আদালত তাকে জামিন ছাড়াই আটক রাখার আবেদন মঞ্জুর করে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি মাসের শুরুতে, যখন জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি নিখোঁজ হন। পরে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে লিমনের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়। একইভাবে ইন্টারস্টেট-২৭৫ সংলগ্ন জলাশয় থেকে আরেকটি দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, যা নাহিদা বৃষ্টির বলে ধারণা করা হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়নি।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীর শেয়ার করা অ্যাপার্টমেন্টে রক্তের দাগ, ফেলে দেওয়া কাপড় ও অন্যান্য আলামত পাওয়া গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হিশামের গাড়ির গতিবিধি অনুসরণ করে পুলিশ লিমনের মরদেহের সন্ধান পায়। তদন্তে আরও জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে হিশাম আবর্জনার ব্যাগ ও ডাক্ট টেপ কিনেছিলেন এবং মরদেহ গুম করার উপায় ইন্টারনেটে খুঁজেছিলেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, হিশামের আগে থেকেই সহিংস আচরণের ইতিহাস ছিল। এমনকি গত শুক্রবারের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, তিনি নিজের ছোট বোনের সাথেও চরম আপত্তিকর ও সহিংস আচরণ করেছিলেন। হিশামের মা নিজেও তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, তার ছেলের চরম রাগ রয়েছে এবং সে অতীতে পরিবারের সদস্যদের ওপরও হামলা করেছে।
নিহতদের পরিবার অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করার পাশাপাশি মরদেহ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দাফনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা চেয়েছে। একইসঙ্গে আবাসন কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। লিমনের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেশে ফেরত পাঠানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের স্মরণে স্মারক স্থাপনের অনুরোধও জানানো হয়েছে।
অ্যাভালন হাইটস কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘আমরা আমাদের একজন আবাসিক শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের অন্যতম সদস্যের মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত। আমরা তদন্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে পূর্ণ সহযোগিতা করছি। তবে চলমান তদন্তের কারণে তারা এর বেশি কিছু বলতে রাজি হয়নি।’
ভাইকে স্মরণ করে জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আমি ওর হাসি, ওর রাগ, এমনকি আমার সাথে ওর খুনসুটিগুলোও মিস করছি। আমি চাই মানুষ জানুক লিমন অনেক পরিশ্রমী, দয়ালু এবং বড় বড় স্বপ্ন দেখা একজন মানুষ ছিল।
বর্তমানে লিমনের এক আত্মীয় ফ্লোরিডায় অবস্থান করছেন এবং মরদেহ দেশে পাঠানো ও আইনি প্রক্রিয়া তদারকি করছেন।
নিহতদের বন্ধুরা জানান, বিদেশে তারা একে অপরের পরিবারের মতো ছিলেন। বন্ধু রিফাতুল ইসলাম বলেন, 'বাড়ি থেকে ৮ হাজার মাইল দূরে এসে এরাই আমাদের পরিবার ছিল। নিজের নিরাপদ ঘর, নিজেদের রান্নাঘরে তারা খুন হয়েছে—এটা ভাবতেই আমরা স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছি।'
আরেক বন্ধু সালমান সাদিক শুভ বলেন, ‘জামিল খুব হাসি-খুশি এবং নম্র ছেলে ছিল। নাহিদাও ছিল অত্যন্ত অমায়িক এক মেয়ে।’
তদন্তকারীরা জনগণের সহায়তা চেয়ে জানিয়েছেন, ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কেউ সন্দেহজনক কিছু দেখে থাকলে পুলিশকে জানাতে। আগামী মাসে গ্র্যান্ড জুরির সামনে মামলাটি তোলা হবে এবং চার্জশিট গঠন করা হবে।
স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ বলেন, ‘এটি একটি চরম ট্র্যাজেডি। আমাদের সবার লক্ষ্য এখন এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য বিচার নিশ্চিত করা।’