ইরান-পাকিস্তান করিডোর © টিডিসি ফটো
ইরানের জন্য একটি বাণিজ্যিক করিডর খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। ফলে, ইরান এখন পণ্য আমদানি-রফতানির জন্য পাকিস্তানের করাচি ও গোয়াদার বন্দর ব্যবহার করতে পারবে।
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ট্রানজিট অব গুডস থ্রু টেরিটোরি অব পাকিস্তান অর্ডার ২০২৬’-এর আওতায় ইরানি পণ্যের জন্য ছয়টি রুট বা করিডর খোলা হয়েছে।
এই করিডরগুলোর মাধ্যমে ইরান এখন পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। একইসঙ্গে, অন্য দেশ থেকে কেনা পণ্যও পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে সহজে ইরানে নিয়ে যাওয়া যাবে।
তবে পাকিস্তান সরকার এমন এক সময়ে এই ঘোষণা দিয়েছে, যখন ইরানে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে দেশটির জন্য আমদানি-রপ্তানি বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাধারণত ল্যান্ডলকড, অর্থাৎ স্থলবেষ্টিত দেশগুলো তৃতীয় কোনো দেশের বন্দর ব্যবহার করে বাণিজ্য করে। যেমন, আফগানিস্তান বহু বছর ধরে পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করছে। ইরানের নিজস্ব বন্দর থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলো কার্যত ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে, পাকিস্তান যেখানে যুদ্ধ অবসানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে, সেখানে ইরানের জন্য পাকিস্তানের এই করিডর চালুর সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা ইরানের সঙ্গে আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
‘পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে পণ্য ট্রানজিট’ আদেশ কী?
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন এই আদেশের মাধ্যমে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে ট্রানজিট বাণিজ্য আরও সহজ করা হয়েছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামালের মতে, এই উদ্যোগ পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াবে এবং পাকিস্তানকে এই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডর ও লজিস্টিকস হাব (রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্র) হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গোয়াদার, করাচি ও তাফতানসহ বিভিন্ন রুটকে ট্রানজিট করিডর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাস্টমস আইনের আওতায় পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে প্রায় ৯০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যেখানে একাধিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত পারাপার পয়েন্ট আছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটার নিকটবর্তী তাফতান সীমান্ত, গোয়াদারের নিকটবর্তী গাবদ সীমান্ত ক্রসিং এবং মানদ-পিশিন সীমান্ত।
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মাঝেও পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে স্বাভাবিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জন্য এই করিডর চালু হলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের জন্য মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে সড়কপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয় এবং সেই চুক্তির ভিত্তিতেই ২০০৬ সালে ‘পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে পণ্য ট্রানজিট’ আদেশ জারি করা হয়, যা এখন নতুন করে কার্যকর করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ইরান এখন তৃতীয় কোনো দেশ থেকে পণ্য আমদানি বা রপ্তানির ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে একটি করিডর হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।
পাকিস্তান সরকার ঘোষিত ছয়টি বাণিজ্যিক রুট হলো:
গাবদ-গোয়াদার
গাবদ-পাসনি-ওরমারা-লিয়ারি-করাচি/পোর্ট কাসিম
তাফতান-দালবান্দিন-খুজদার-করাচি/পোর্ট কাসিম
তাফতান-নোকুন্ডি-দালবান্দিন-কোয়েটা/লাক পাস-খুজদার-বিসমা-নাংগ-পাঞ্জগুর-হোশাব-তুরবাত-গোয়াদার
তাফতান-নোকুন্ডি-দালবান্দিন-কোয়েটা/লাক পাস-খুজদার-লিয়ারি-গোয়াদার
গাবদ-গোয়াদার-করাচি/পোর্ট কাসিম
এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কতটা?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবিদ সুলেহরি’র মতে, এটি ধারণা করা যায় যে যুক্তরাষ্টকে জানিয়েই ইরানের জন্য এই বাণিজ্যিক করিডর খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান।
পাকিস্তানের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ড. জুবায়ের খানের ভাষায়, ইরানকে দেওয়া এই বাণিজ্যিক করিডর সেই একই শর্তে পরিচালিত হবে, যেগুলো আফগানিস্তানসহ অন্যান্য স্থলবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড) দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তার মতে, যুদ্ধ ও মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান এখন কার্যত একটি স্থলবেষ্টিত দেশে পরিণত হয়েছে। সেক্ষেত্রে, এই সিদ্ধান্তের কারণ পাকিস্তান যেমন একদিকে ট্রানজিট ফি পাবে, তেমনি ইরানের জনগণের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবও বাড়বে।
সিনিয়র সাংবাদিক মুশতাক ঘুমানের মতে, ইরান সরকারের অনুরোধেই পাকিস্তান এই করিডর চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ার পর ইরানের নেতৃত্ব পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সুবিধা চায়। এরপর শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, অতীতে পাকিস্তান আফগানিস্তানকে বাণিজ্যিক করিডর দিয়েছে। এখন ইরানকে এই সুবিধা দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের জন্য মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবিদ সুলেহরি আরও বলেন, করিডর চালুর আগে পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় 'লেটার অব ক্রেডিট'-এর শর্ত শিথিল করে। এরপরই ট্রানজিট করিডর চালু করা হয়।
তার মতে, এই পদক্ষেপে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়বে এবং পারস্পরিক আস্থা আরও জোরদার হবে।
মার্কিন ও বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও পাকিস্তান কি ইরানকে ট্রানজিট দিতে পারে?
ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ হলেও পাকিস্তান তার জ্বালানির সিংহভাগই সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে।
ইরানের ওপর আরোপিত বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংকিং চ্যানেলের সীমাবদ্ধতার কারণে পাকিস্তান ইরান থেকে তেল আমদানি করে না।
তবে পণ্য বিনিময় (বার্টার) ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যসহ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাণিজ্য দুই দেশের মধ্যে বরাবরই চলমান ছিল, যা যুদ্ধের সময়ও অব্যাহত ছিল।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের ওপর মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান কি ইরানকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে পারে?
পাকিস্তানের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ড. জুবায়ের খানের মতে, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী পাকিস্তান এমন একটি দেশকে বাণিজ্যিক করিডর দিচ্ছে, যেটি এখন স্থলবেষ্টিত হয়ে পড়েছে।
তার মতে, ইরানকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার কারণে পাকিস্তান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে না। কারণ এখানে পাকিস্তান সরাসরি বাণিজ্য বাড়াচ্ছে না, বরং শুধু একটি ট্রানজিট রুট দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবিদ সুলেহরি মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে কথা বলেছে পাকিস্তান।
যুক্তরাষ্ট্রকে না জানিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি।
সিনিয়র সাংবাদিক মুশতাক ঘুমান বলেন, ইরানে যুদ্ধের কারণে ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরান মূলত এমন পণ্যই
আমদানি-রপ্তানি করবে, যেগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
বিকল্প রুট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ার স্বপ্ন পাকিস্তানের
অর্থনীতিবিদদের মতে, আঞ্চলিক ট্রানজিট বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠার জন্য এটি পাকিস্তানের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করবে।
চলতি মাসেই পাকিস্তান-ইরান ট্রানজিট করিডরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রথম চালানটি ইরান হয়ে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে তখন পাকিস্তানের ট্রানজিট ট্রেড মহাপরিচালকের দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, করাচি থেকে ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য গাবদ ও রামিদান সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে প্রবেশ করবে এবং সেখান থেকে উজবেকিস্তানে যাবে।
তাতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই উদ্যোগ বৈশ্বিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক সংযোগ এবং পাকিস্তানসহ পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
ড. আবিদ সুলেহরি বলেন, ২০১৮ সালে পাকিস্তান ও ইরান একটি বাণিজ্যিক করিডর খুলতে সম্মত হয়েছিল; যার ব্যাপ্তি হবে ইরানের মধ্য দিয়ে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে চীন।
তার মতে, ইরান যদি পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করে, তাহলে পাকিস্তানও ইরানের মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, এই করিডর পাকিস্তানের জন্য আফগানিস্তানের বিকল্প হিসেবে তুলনামূলক আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল একটি বাণিজ্যিক পথ তৈরি করবে।
উল্লেখ্য, অতীতে পাকিস্তানের জন্য মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে স্থলপথে সংযুক্ত হওয়ার একমাত্র রুট ছিল আফগানিস্তান। তবে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও তালেবানের সঙ্গে উত্তেজনার কারণে দুই দেশের সীমান্ত হওয়ায় পাকিস্তানের বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটেছে।
গত বছরের উত্তেজনার পর থেকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। তাই মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে নির্বিঘ্ন বাণিজ্যের জন্য পাকিস্তান বিকল্প পথ খুঁজছে।
ড. আবিদ সুলেহরির মতে, ইরানের জন্য ট্রানজিট রুট খোলার মাধ্যমে পাকিস্তান একদিকে যেমন সংকটকালে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে আফগানিস্তানের বিকল্প হিসেবে একটি নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যপথও তৈরি করেছে।
তার মতে, এই পদক্ষেপ পাকিস্তান ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যে পাকিস্তানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে।
এর আগে ইরানে যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক জাহাজ পাকিস্তানের বন্দরে নোঙর করেছিল এবং তখন করাচি বন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বেড়ে গিয়েছিল।
সিনিয়র সাংবাদিক মুশতাক ঘুমান বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের গোয়াদার ও করাচি বন্দরের কার্যক্রম আরও দ্রুততর হবে।