ইরান © সংগৃহীত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনা আবারও যখন নতুন করে শুরু হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের কারণে এই বিপুল অর্থ এখন বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ‘ফ্রোজেন’ অবস্থায় রয়েছে।
এই অর্থ ফেরত পাওয়া ইরানের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান এবং নিষেধাজ্ঞার জটিল ইতিহাসের কারণে বিষয়টি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ কত
সরকারি বিভিন্ন ইরানি প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলারেরও বেশি।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার আল জাজিরাকে বলেন, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক জ্বালানি আয়ের প্রায় তিনগুণ।
তিনি বলেন, 'দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা একটি সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত বিশাল অংকের অর্থ।'
তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অর্থ ছেড়েও দেয়, তবে তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো শর্ত আরোপ করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
স্নাইডার জানান, দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা ও আলোচনার জটিল ইতিহাসের কারণে ইরান এই অর্থ নিয়ে সন্দিহান অবস্থায় রয়েছে।
২০১৬ সালে বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় তৎকালীন ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যাকব লিউ কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও ইরান পুরো অর্থ ব্যবহার করতে পারবে না, কারণ এর বড় অংশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিনিয়োগ ও ঋণ পরিশোধে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
বর্তমানে ইরান অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে, যাকে তারা ‘আস্থা তৈরির পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে।
কেন ইরানের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে
মার্কিন নথিপত্র অনুযায়ী, প্রথমবার ইরানের সম্পদ জব্দ করা হয় ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ‘অস্বাভাবিক ও চরম হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
সেই সময় ইরানি ছাত্ররা তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করেছিল।
১৯৮১ সালে আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে ইরান ৫২ জন মার্কিন বন্দী মুক্তি দিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্পদের একটি বড় অংশ ছেড়ে দেয়। তবে পরবর্তীতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও খারাপ হয়।
ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ জ্বালানি ব্যবহারের জন্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বরাবরই এটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে এসেছে।
২০১৫ সালে জেসিপিওএ চুক্তির মাধ্যমে ইরান আবারও তাদের অধিকাংশ সম্পদে প্রবেশাধিকার পায়। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, ফলে সম্পদ আবারও জব্দ অবস্থায় চলে যায়।
২০২৩ সালে একটি বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার তেল বিক্রির অর্থ কাতারের একটি ব্যাংকে স্থানান্তরের অনুমতি দেয় বাইডেন প্রশাসন। তবে পরবর্তী বছরে ইসরায়েলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে দোহায় থাকা সেই অর্থ আবারও আটকে যায়। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিভিন্ন অভিযোগে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদের একটি অংশ জব্দ করে রেখেছে।
কোন দেশে ইরানের কত সম্পদ আছে
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে ইরানের জব্দকৃত বা আটকে থাকা সম্পদের একটি বড় অংশ ছড়িয়ে আছে। চীনে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার ইরানের সম্পদ আটকে রয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। ইরাকে রয়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
কাতারে ইরানের ৬ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে, যা মূলত দক্ষিণ কোরিয়া থেকে স্থানান্তরিত অর্থ। যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। জাপানে ইরানের আটকে থাকা সম্পদ প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপের লাক্সেমবার্গে রয়েছে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার।
জব্দকৃত সম্পদ কী
যখন কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ, সম্পদ বা সিকিউরিটিজ অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা সাময়িকভাবে আটকে রাখে, তখন সেটিকে জব্দকৃত সম্পদ বা ফ্রোজেন অ্যাসেট বলা হয়।
নিষেধাজ্ঞা বা আদালতের নির্দেশের কারণে এসব অর্থ মালিকপক্ষ ব্যবহার, স্থানান্তর বা বিক্রি করতে পারে না।
সাধারণত অর্থপাচার, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বা নিরাপত্তাজনিত অভিযোগে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে সমালোচকদের মতে, এটি অনেক সময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
কেন এই সম্পদ ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে এবং রিয়ালের মান কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেলে তা ইরানের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান হবে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিক্ষক রোকসানা ফারমানফার্মিয়ান বলেন, 'এই অর্থ ফেরত পেলে ইরান তাদের অর্থনীতির অস্থিরতা কাটাতে পারবে এবং মুদ্রার মানের পতন রোধ করতে পারবে। এছাড়া তাদের তেলক্ষেত্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ গ্রিড—যা বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে—সেগুলোর আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে।'
তিনি আরও বলেন, এই অর্থ যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন এবং দুর্নীতি কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন মনে করেন, এই অর্থ ছেড়ে দেওয়া হবে একটি বড় কূটনৈতিক বার্তা। এটি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমার ইঙ্গিত দেবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
সংবাদসূত্রঃ আল জাজিরা