যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ‘ক্ষতিপূরণ’ পাচ্ছে ইরান? 

১৬ জুন ২০২৬, ১০:১৪ PM
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ একটি স্থাপনা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ একটি স্থাপনা © সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া চুক্তিকে কেন্দ্র করে ৩০০ বিলিয়ন (৩০,০০০ কোটি) ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক মহলে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করা এবং বিশ্ববাজারকে ওলটপালট করে দেওয়া এই বিধ্বংসী যুদ্ধ থামানোর অংশ হিসেবে এই বিশাল আর্থিক প্যাকেজের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। খবর আল জাজিরার

গত রবিবার (১৪ জুন) উভয় পক্ষ ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই ১৪ দফার খসড়া সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে এবং আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিবিএস নিউজকে (CBS News) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই বিশাল প্রণোদনা বা তহবিল মূলত চুক্তির শর্ত ও বাধ্যবাধকতা পালনে ইরানের ‘পারফরম্যান্স’ বা কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে। তবে এই তহবিলের বিশাল অংকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে আসতেই মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে ওবামা প্রশাসনের ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির কড়া সমালোচনা করে আসছিলেন এই বলে যে, ওই চুক্তি তেহরানকে বিপুল আর্থিক সুবিধা দিয়েছিল।

ফলে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এই বিষয়টির নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৩০০ মিলিয়ন (কিংবা বিলিয়ন) ডলার দিচ্ছে—এই খবরটি সম্পূর্ণ ভুয়া ।’

অন্যদিকে জেডি ভ্যান্স কিছুটা কৌশলী হয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, এটি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে আমেরিকার পক্ষ থেকে দেওয়া কোনো নগদ অর্থ বা ‘পেনাল্টি আউট’ নয়। ভ্যান্স বলেন, ‘যখন মানুষ বলে যে শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা হচ্ছে, তা সত্যি নয়। সত্য হলো, ইরান যদি এই চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলে, তবে তাদের সামনে আরও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ উন্মোচিত হবে।’ 

তিনি জানান, এই তহবিলটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থ দিয়ে নয়, বরং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনাকারী উপসাগরীয় দেশগুলোর যৌথ অর্থায়নে গঠিত হবে। তবে এর জন্য ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের অনুমতি দিতে হবে।

নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা গেছে, এই তহবিলটি কোনো সরকারি অনুদান নয়, বরং ইরানের বাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেসরকারি কোম্পানির সমন্বয়ে তৈরি একটি বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম হবে। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো মুহানাদ সেলুম আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘নো-লুজ’ পরিস্থিতি। ইরান যদি নিজেদের সংশোধন করে, তবে শান্তির পুরো কৃতিত্ব পাবে ট্রাম্প প্রশাসন; আর যদি তারা চুক্তি ভঙ্গ করে, তবে আমেরিকার কোনো আর্থিক ক্ষতি নেই, পুরো ঝুঁকি বহন করবে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো।’

আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিতর্ক

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ‘মেহের নিউজ’ রবিবার এক প্রতিবেদনে দাবি করে, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের নিজস্ব ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত বা আনফ্রিজ করা হবে। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে এবং পরবর্তীতে পারমাণবিক ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে আন্তর্জাতিক ব্যাংকে ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি তেল বিক্রির অর্থ আটকে আছে।

তবে এই ২৪ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করার দাবিটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, ‘২৪ বিলিয়ন ডলারের এই ফিগারটি আমাদের আলোচিত কোনো টেক্সট বা নথির কোথাও নেই। আমরা আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি আছি, তবে তার চেয়েও বড় বিষয় হলো ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যা দীর্ঘ মেয়াদে তাদের পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার ওপর নির্ভর করছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের জন্য (যেখানে যুদ্ধের কারণে ২৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে এবং ১৯৪২ সালের পর সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি চলছে) এই তহবিলটি একটি ‘লাইফলাইন’ হলেও, এটি তেহরানের জন্য কিছুটা ‘মর্যাদাহানিকর’। কারণ এটি কোনো স্বাধীন সার্বভৌম তহবিল নয়, বরং আমেরিকার শর্তাধীন এবং নজরদারিতে থাকা অর্থ।

পরবর্তী ৬০ দিনের এজেন্ডা ও বিতর্কিত বিষয়সমূহ

আগামী শুক্রবার চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য চলমান যুদ্ধবিরতি বর্ধিত হবে। এই সময়ের মধ্যে মূলত ৩টি প্রধান ও জটিল বিষয়ে কারিগরি ও কূটনৈতিক আলোচনা চলবে:

১. ইউরেনিয়াম মজুদ হস্তান্তর: ইরানের কাছে বর্তমানে ৪৪০ কেজিরও বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ রয়েছে। জেডি ভ্যান্সের দাবি অনুযায়ী, ইরান তাদের এই মজুদ আত্মসমর্পণ করতে, নিয়মিত আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে রাজি হতে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার শর্তে সম্মত হয়েছে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ মূল কপি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

২. হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ: ট্রাম্প চুক্তির পর ‘তেল প্রবাহিত হতে দাও’ (Let the oil flow!) বলে স্লোগান দিলেও, জেডি ভ্যান্স সিএনবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে সব জটিলতা এখনও কাটেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা, এই আন্তর্জাতিক জলপথটি দীর্ঘ মেয়াদে সম্পূর্ণ ‘টোল-মুক্ত’ উপায়ে উন্মুক্ত থাকবে, যা আগামী ৬০ দিনের কারিগরি আলোচনায় চূড়ান্ত হবে।

৩. লেবানন ও ইসরায়েল সংকট: ইরান দাবি করেছে যে এই চুক্তির আওতায় লেবাননেও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে হবে। কিন্তু ইসরায়েল এই শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়নি এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কী চুক্তি হলো তা বিবেচনা না করে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এই চুক্তি থেকে ইরান অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে তবে তারা পুরোপুরি এর ওপর নির্ভরশীল হবে না। পূর্ববর্তী চুক্তি বাতিলের (২০১৮ সালে ট্রাম্পের চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া) ইতিহাস টেনে তিনি কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। 

তবে ইরানের রক্ষণশীল মহলে এই চুক্তির সময় নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে, কারণ চুক্তির ঘোষণার দিনটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিন। কট্টরপন্থী সাংবাদিক পারিসা নাসর এক্স-এ লিখেছেন, ‘আমেরিকার সাথে যুদ্ধে শহীদ হওয়া প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতার (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) হত্যাকারীকে জন্মদিনের উপহার দেওয়া কি চুক্তির কোনো অলিখিত শর্ত ছিল?’

অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতির সত্যতা বাস্তবে পরীক্ষা করার জন্যই ইরানের ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। ফ্রান্সে চলমান জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘ন্যায্য ও ভালো’ হিসেবে অভিহিত করে ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, করলে তাদের উড়িয়ে দেওয়া হবে।’

অন্যদিকে কাতার ও অঞ্চলটির অন্য দেশগুলো এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের আইন প্রণেতারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও এর স্বচ্ছতা এবং ইরানের ব্যাখ্যার ভিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

যে পাঁচ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হলো ট্রাম্পের
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
এইচএসসির ফলাফলে ধস, শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরাতে মাইকিং
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
দুই যুগেও মেলেনি এমপিও, ঋণের চাপে সর্বস্বান্ত হয়ে প্রাণ গেল…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের ছেলেকে ছুরিকাঘাত
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
হামের টিকা নিয়ে তদন্ত করছে সরকার
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জায়গা দখল করে ছাত্রদল নেতার অবৈধ দোকান, নিউজ করায় সাংবাদিকে…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950