পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সংঘাতের মাঝে থাকা ডুরান্ড লাইন কী, কেন এ নিয়ে বিতর্ক?

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৮ PM
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী তোরখাম সীমান্তে তালেবান সৈন্যরা

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী তোরখাম সীমান্তে তালেবান সৈন্যরা © সংগৃহীত

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘাতের আবহে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তরেখা—ডুরান্ড লাইন। ১৮৯৩ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি ঘিরে ১৩২ বছর পরও বিতর্ক থামেনি। ঐতিহাসিক, আইনি ও রাজনৈতিক নানা মাত্রা মিলিয়ে ডুরান্ড লাইন আজও দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম জটিল ইস্যু।

চুক্তির সূচনা: ১৮৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর

১৮৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের পররাষ্ট্র সচিব স্যার হেনরি মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগানিস্তানের আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ডুরান্ড লাইনের নামকরণ করা হয় স্যার ডুরান্ডের নাম অনুসারে।

চুক্তির প্রশংসা করে আমির আব্দুর রহমান খান সে সময় বলেছিলেন, “এই প্রথমবার একটি স্পষ্ট সীমান্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয় এবং ব্রিটিশ অস্ত্রসস্ত্রের সাহায্যে আফগানিস্তান আরও শক্তিশালী ও মজবুত হয়ে ওঠে।”

তবে এই চুক্তির মাধ্যমে তিনি আফগান প্রভাবের বাইরে থাকা একটি বিশাল অঞ্চলের সার্বভৌমত্বের দাবি ত্যাগ করেন। বর্তমানে সেই অঞ্চল পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া ও বালুচিস্তান প্রদেশের অংশ।

‘গ্রেট গেম’ ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ঊনবিংশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ‘গ্রেট গেম’ নামে পরিচিত। রাশিয়ার দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ১৮৩৯ সালে ব্রিটেন আফগানিস্তান আক্রমণ করে।

১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা পাঞ্জাব দখল করে এবং সিন্ধু নদীর পশ্চিমে অবস্থিত অসংজ্ঞায়িত শিখ সীমান্ত নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে। পশতুন অধ্যুষিত এই সীমান্ত অঞ্চল শাসন ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের জন্য জটিল হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ প্রশাসনের ভেতরেও মতপার্থক্য ছিল—‘স্ট্যাটিক স্কুল’ সিন্ধু নদ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে চাইলেও ‘ফরোয়ার্ড স্কুল’ কাবুল, গজনী ও কান্দাহার পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার পক্ষে ছিল।

১৮৭৮ সালের যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়ী হলে আব্দুর রহমান খানকে আমির নিযুক্ত করা হয়। ১৮৭৯ সালের গন্দমাক চুক্তি অনুযায়ী আফগানিস্তানের বৈদেশিক নীতি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে যায়, যদিও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার গ্যারান্টি দেওয়া হয়।

সীমান্ত নির্ধারণের প্রক্রিয়া

১৮৯৩ সালের চুক্তি ছিল মাত্র এক পৃষ্ঠার। ১৮৯৪ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত আফগান-ব্রিটিশ যৌথ জরিপের মাধ্যমে সীমান্ত নির্ধারণ সম্পন্ন হয়।

ডুরান্ড লাইনের পশ্চিম প্রান্ত ইরান সীমান্তে গিয়ে মেশে এবং পূর্ব প্রান্ত চীন সীমান্তে মিলিত হয়। এর একদিকে আফগানিস্তানের ১২টি প্রদেশ, অন্যদিকে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া, বালুচিস্তান ও গিলগিত-বালতিস্তান।

ব্রিটিশ কর্মকর্তা ওলাফ কারো তার বই *দ্য পাঠান*-এ লিখেছেন, আলোচনার সময় আমির তার মীর মুন্সী সুলতান মোহাম্মদ খানকে পর্দার আড়ালে বসিয়ে সব কথোপকথনের নোট রাখার নির্দেশ দেন। আলোচনায় চিত্রাল ও ব্রোগিল পাস থেকে পেশোয়ার হয়ে কোহ-এ-মালিক সিয়া পর্যন্ত সীমান্ত নির্ধারণে সম্মতি হয়।

আমিরের ভাষ্যমতে, তিনি ওয়াখান, কাফিরিস্তান, আসমার, লালপোরা মোহমান্দ ও ওয়াজিরিস্তানের একটি অংশ নিজের সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। অপরদিকে নয়া চমন, চাঘি রেলওয়ে স্টেশন, ওয়াজিরি অঞ্চলের বাকি অংশ, বুলন্দখেল, কুররাম, আফ্রিদি, বাজৌর, সোয়াত, বুনের, দির, চিলাস ও চিত্রালের ওপর অধিকার ত্যাগ করেন।

তবে চুক্তিতে এই রেখাকে সরাসরি আন্তর্জাতিক সীমান্ত বলা হয়নি; বরং আমিরের ক্ষমতার সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

রাওয়ালপিন্ডি ও কাবুল চুক্তি

১৯১৯ সালে তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের পর রাওয়ালপিন্ডি চুক্তির মাধ্যমে আফগানিস্তান তার বৈদেশিক নীতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং ডুরান্ড লাইনকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সরকারি সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৯২১ সালের কাবুল চুক্তিতে দুই পক্ষ আবারও সীমান্ত পুনর্ব্যক্ত করে। ১৯২৩ সালের বাণিজ্য চুক্তি ও ১৯৩০ সালের ব্যবস্থাতেও ডুরান্ড লাইন কার্যত আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ও বিতর্কের সূচনা

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর পাকিস্তান ডুরান্ড চুক্তির উত্তরাধিকারী হয়। তবে আফগানিস্তান পাকিস্তানের জাতিসংঘ সদস্যপদের বিরুদ্ধে ভোট দেয় এবং ডুরান্ড লাইনকে ‘ব্রিটিশদের চাপের ফল’ আখ্যা দিয়ে ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণা করে।

পরে তারা সেই নেতিবাচক ভোট প্রত্যাহার করে এবং ১৯৪৮ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয়।

আফগানিস্তানে ‘পশতুনস্তান’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিও ওঠে। ১৯৬০ সালে সর্দার মোহাম্মদ দাউদ বাজাউরে সৈন্য পাঠালে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।

সমাধানের সম্ভাবনা ও ব্যর্থতা

১৯৭৬ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো কাবুল সফর করেন এবং দাউদ ইসলামাবাদে যান। ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কিছু রাজনৈতিক সমঝোতার বিনিময়ে দাউদ ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন।

কিন্তু ১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল অভ্যুত্থানে দাউদ নিহত হন। এরপর পিডিপিএ ক্ষমতায় আসে এবং ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে নতুন অস্থিরতার যুগ শুরু হয়। ফলে সম্ভাব্য সমাধান আর এগোয়নি।

১০০ বছরের মেয়াদ বিতর্ক

আফগানিস্তানে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে ডুরান্ড চুক্তির মেয়াদ ছিল ১০০ বছর এবং ১৯৯৩ সালে তা শেষ হয়েছে। তবে কোনো চুক্তিতে এ ধরনের সময়সীমার উল্লেখ নেই বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমতে, নতুন রাষ্ট্র পূর্ববর্তী সীমান্ত চুক্তির ধারাবাহিকতা বহন করে। পাকিস্তান এই নীতির ভিত্তিতে ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং সেখানে বেড়া ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আফগানিস্তান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্ত ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান আফগান তালেবান সরকারের কাছে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।

পাকিস্তান কাবুলে হামলার দাবি করে জানায়, তাদের লক্ষ্য ছিল টিটিপি। আফগানিস্তান পাল্টা ডুরান্ড লাইনের কাছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে নিশানা করে।

দোহায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব ডুরান্ড লাইনকে ‘কাল্পনিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, আফগানিস্তান কখনোই এই সীমান্ত মেনে নেয়নি এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আফগানরাই।

কেন বিতর্ক থামছে না?

ডুরান্ড লাইন পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। সীমান্তের দুই পাশে থাকা জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক গভীর। আফগানিস্তান এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিলেও পাকিস্তান এটিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে মেনে চলেছে।

ঐতিহাসিক দাবি, আইনি ব্যাখ্যা, জাতিগত রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যু—সব মিলিয়ে ডুরান্ড লাইন আজও পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বিতর্ক। ১৮৯৩ সালের একটি একপাতার চুক্তি যে এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের উৎস হয়ে থাকবে, তা হয়তো সে সময় কেউ ভাবেনি।

নতুন চোটে শঙ্কায় নেইমারের বিশ্বকাপ স্বপ্ন
  • ২২ মে ২০২৬
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঈদের ছুটি শুরু আজ, শনিবার ক্লাস চলবে প্রা…
  • ২২ মে ২০২৬
হামজা-ফাহমিদুলদের কোচ হচ্ছেন টমাস ডুলি!
  • ২২ মে ২০২৬
দুপুরের মধ্যে যে ১১ জেলায় ৮০ কিমি বেগে কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস
  • ২২ মে ২০২৬
আজ টানা ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়
  • ২২ মে ২০২৬
তারকা হল্যান্ডকে নিয়ে শক্তিশালী দল ঘোষণা নরওয়ের
  • ২২ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081