কিউবা প্রেসিডেন্ট © বিবিসি
ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে কিউবার মতো আর কোনো দেশ এত বেশি প্রভাবিত হয়নি। ১৯৯৯ সালে হাভানা বিমানবন্দরে তৎকালীন তরুণ ভেনিজুয়েলান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হুগো চ্যাভেজ এবং কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের পর থেকে দুই দেশ একই সমাজতান্ত্রিক আদর্শে পথ চলে আসছে।
বছরের পর বছর ধরে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পৌঁছে যেত কিউবায়, আর বিনিময়ে কিউবা থেকে ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীরা যেতেন ভেনিজুয়েলায়। চ্যাভেজের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো ছিলেন কিউবার অত্যন্ত আস্থাভাজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’-এর অভিযানে মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির পর কিউবার সামনে এখন এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।
কিউবার কঠোর নিন্দা ও শোক প্রকাশ কিউবা সরকার এই মার্কিন অভিযানকে অবৈধ ঘোষণা করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। অভিযানে নিহত ৩২ জন কিউবান নাগরিকের স্মরণে দেশটিতে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই ৩২ জনের মৃত্যু একটি গোপন সত্যকে সামনে এনেছে। মাদুরোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বডিগার্ডদের প্রায় সবাই ছিলেন কিউবান। এছাড়া ভেনিজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীতেও কিউবানদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
কিউবান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল এই ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, 'সাম্রাজ্যবাদী পোশাকে আসা সন্ত্রাসীদের' মোকাবিলা করতে গিয়ে যে ৩২ জন 'সাহসী কিউবান যোদ্ধা' ভেনিজুয়েলায় প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের যথাযথ সম্মান জানানো হবে।
ভেনিজুয়েলা প্রতিদিন প্রায় ৩৫,০০০ ব্যারেল তেল কিউবায় পাঠায়। ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়িতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো আটকে যাওয়ায় কিউবায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাসের পর মাস ধরে পুরো দ্বীপে লোডশেডিং চলছে। ফ্রিজে খাবার পচে যাচ্ছে, প্রচণ্ড গরমে পাখা বা এসি চালানো যাচ্ছে না, আর মশার উপদ্রবে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। কিউবার একসময়ের গর্বের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন এই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ল্যাটিন আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পেছনের আঙিনা’ হিসেবে দেখছেন। তিনি এই নতুন পরিস্থিতির নাম দিয়েছেন 'ডনরো ডকট্রিন'। ট্রাম্পের সাফ কথা, ভেনিজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন নেত্রী ডেলসি রদ্রিগেজ যদি মার্কিন কথা মতো 'ভালোভাবে না চলেন, তবে আরও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।'
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মনে করেন, ভেনিজুয়েলা থেকে মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়া এবং কিউবার তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়াটাই হবে হাভানায় ৬০ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটানোর মূল চাবিকাঠি।
কিউবার বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি দেখে ট্রাম্প অনেকটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেছেন, 'কিউবা এখন পতনের জন্য প্রস্তুত।'
ল্যাটিন আমেরিকার সমালোচকরা একে যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে অভিহিত করলেও ট্রাম্প তাতে ভ্রুক্ষেপ করছেন না। সব মিলিয়ে, ভেনিজুয়েলায় তেলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে কিউবার সাধারণ মানুষ।