নিয়মের বেড়াজাল আর র‌্যাঙ্কিংয়ে অবনতি বিদেশি শিক্ষার্থী কমাচ্ছে ঢাবির

বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
বিদেশি শিক্ষার্থী দিন দিন কমছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  © ফাইল ফটো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কমছে। শিক্ষার মানের জন্য একদা ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত হলেও এটি মানতে পারছেন না অনেকে। এজন্য বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, বিদেশি বান্ধব ক্যাম্পাস না হওয়া, আবাসন সুবিধার অভাব ও অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ সমাধানে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেও দায়ী করছেন অনেকে।

ইউএনবি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঢাবির বিভিন্ন বিভাগ ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ হাজার ১৬০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী এবং পে-রোল আওতায় ১৯ জন শিক্ষক নিযুক্ত আছেন। স্যার পি জে হার্টজ আন্তর্জাতিক হলের সংযুক্তিতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সহায়তা ডেস্ক থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে স্যার পি জে হার্টজ আন্তর্জাতিক হলের প্রভোস্ট ড. মো. মহিউদ্দিন জানান, বর্তমানে হলটিতে ১১৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। এরমধ্যে ৩৮ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত। বাকিরা অধিভুক্ত মেডিকেল ইনস্টিটিউটের।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩টিতে প্রায় ৮০৪ জন বিদেশি শিক্ষার্থী আছেন। আর দেশে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭টিতে এক হাজার ৩৮৬ জন পড়াশুনা করছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চিরাচরিত ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী যেভাবে বিজ্ঞাপন দেয় সেভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেয়া হয় না। ফলে, যে বিষয়গুলো পড়াই ও যেসব ডিগ্রি কোর্স আছে আমাদের, সে সম্পর্কে বিদেশি শিক্ষার্থীরা জানে না। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে না পারার জন্য গণমাধ্যমে নেতিবাচক কাভারেজকেও দায়ী করেন তিনি। এছাড়া কর্তৃপক্ষের কৌশলগত বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা দরকার বলে মত এই অধ্যাপকের।

এদিকে র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছিয়ে পড়াও বিদেশি শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতে না পারার পেছনে দায়ী বলে মত অনেকের। যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ২০২১ সালের র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রথম এক হাজারের মধ্যে আছে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট। তবে, ২০০২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রায় দুইশ পিছিয়ে ৮০০-১০০০ এরমধ্যে রয়েছে ঢাবি।

জানা গেছে, বর্তমান পদ্ধতিতে বিদেশি শিক্ষার্থীকে প্রথমে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। অনুমোদন পাওয়ার পর, শিক্ষার্থীকে ঢাবিতে যোগাযোগ করতে হয়। অনলাইনে এ প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। এসব প্রক্রিয়া ও বাধা সহজ করলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে গতি আসবে বলে মত অধ্যাপক ইমতিয়াজের।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার শিউলি আফসার বলেন, ভর্তির জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। পুলিশি তদন্তের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাড়পত্র পাঠায়। এরপর বিদেশি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন। একজন শিক্ষার্থীকে প্রতি বছর ভিসা নবায়ন করতে হয়। সেজন্য তাদেরকে পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে। এ সব পদ্ধতি বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের ছাত্রাবাসের অভাব রয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।

তবে শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের উদ্বেগ নিরসনে এগিয়ে আসলে ও নিয়মিত কাউন্সিলিং করলে সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে (আইএমএল) ইংরেজিতে পড়তে আসা তুরস্কের শিক্ষার্থী উমুত দালার বলেন, ‘ভর্তির পরেও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমস্যার পড়তে হয়। বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং করলে তারা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারে এবং সমাধানে কর্তৃপক্ষ সহায়তা করতে পারে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা এ সব সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে তথ্য, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা প্রচারে আন্তর্জাতিক বিষয়ক কার্যালয়ও গঠন করেছি।’


মন্তব্য