সুইডেনের কেন্দ্রীয় ভর্তি কর্তৃপক্ষ থেকে দেওয়া ই-মেইল © টিডিসি সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের স্নাতক শেষ করা ছাত্রী জিনিয়া তাসনিম। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই ছাত্রী সুইডেনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এই ছাত্রীর দাবি, একাডেমিক কাগজপত্র যাচাইয়ের (ভেরিফিকেশন) জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সুইডেনের কেন্দ্রীয় ভর্তি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অর্থ দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে যা সুইডেনের কেন্দ্রীয় ভর্তি কর্তৃপক্ষ দিতে অস্বীকার করে। ফলে সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আবেদনটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ কারণে ওই দেশের উচ্চশিক্ষায় তিনি এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সুইডেনের কেন্দ্রীয় ভর্তি কর্তৃপক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি ই-মেইল পেয়েছেন জিনিয়া তাসনিম। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটি ভাইরাল হলে তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সনদ-নম্বরপত্র প্রভৃতি কাগজপত্র ভেরিফিকেশনে একটি নির্দিষ্ট ফি আদায় করা হয়। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী নেওয়া হয় এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আয়।
সুইডেনের কেন্দ্রীয় ভর্তি কর্তৃপক্ষ এক ই-মেইলে ঢাবি ছাত্রীকে বলছে, ‘আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পূর্ণরূপে মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে আপনার আবেদনের অবস্থা আন-কোয়ালিফাইড রয়েছে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আপনার শিক্ষাগত ডিগ্রি যাচাই করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু এর জন্য তারা নির্দিষ্ট একটি অর্থ দাবি করেছে। সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কর্তৃপক্ষ এ ধরনের একাডেমিক কাগজপত্র যাচাইয়ে কোনো অর্থ প্রদান করে না। আপনি চলতি মার্চ মাসের শুরুতে এ বিষয়ে একটি বার্তা পেয়েছেন।’’
ভুক্তভোগী ছাত্রী জিনিয়া তাসনিম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি আমার সব ডকুমেন্ট সত্যায়িত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভেলপে করে ডিএইচএল-এর (বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কুরিয়ার পরিষেবা) মাধ্যমে সুইডেনে পাঠাই। এরপর আমাকে ভিডিও কলে একটি ইন্টারভিউ নেওয়া হয়।
পরে একটি গ্রুপে দেখি অনেকেরই ‘আন-কোয়ালিফাইড’ দেখাচ্ছে। ঈদের আগের দিন আমি সুইডেনের কেন্দ্রীয় ভর্তি পোর্টালে ঢুকে দেখি আমাকেও ‘আন-কোয়ালিফাইড’ দেখাচ্ছে। সেখানে কারণ হিসেবে লেখা ছিল আমার ক্রেডিট ১৮০ ইসিটিএসের কম। কিন্তু আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর ডিগ্রিতে মোট ইসিটিএস ২৪০।
এরপর ওই রাতেই বিষয়টি নিয়ে খোঁজ-খবর করি এবং বুঝতে পারি ই-মেইল করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমি সেদিনই পোর্টালের মাধ্যমে ই-মেইল পাঠাই, কিন্তু কোনো জবাব পাইনি। পরে ২৪ মার্চ আবার একই বিষয় উল্লেখ করে ই-মেইল করি, কারণ ২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) রেজাল্ট প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। যথারীতি ২৬ তারিখে রেজাল্ট প্রকাশিত হয় এবং সেদিন সন্ধ্যায় আমাকে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়।
আমি তাদেরকে ইমেইলে জানাই যে, তারা ভুল কারণে আমাকে আন-কোয়ালিফাইড দেখিয়েছে। আমার ব্যাচেলর ডিগ্রির ইসিটিএস ২৪০, ১৮০ নয়। আমি অনুরোধ করি তারা যেন আমার ডকুমেন্টগুলো আবার রিচেক করে এবং প্রয়োজনে আমি ই-মেইলে পুনরায় ডকুমেন্ট পাঠাতে প্রস্তুত আছি।
ফিরতি ই-মেইলে তারা জানায়, তারা আমার ডকুমেন্ট হাতে পেয়েছে এবং ভেরিফিকেশনের জন্য আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ই-মেইল করেছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেখান থেকে ভেরিফিকেশন করতে টাকা চেয়েছে, অর্থাৎ পেমেন্ট করলে তারা ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সুইডেনের পোর্টাল থেকেও আমাকে এ বিষয়ে কোনো ই-মেইল করা হয়নি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ও আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। অথচ তারা চাইলে আমাকে ই-মেইল করতে পারত, ফোন করতে পারত বা যেকোনোভাবে জানাতে পারত।
তিনি আরও বলেন, আমার কাছে তো কোনো তথ্যই ছিল না যে ভেরিফিকেশনের জন্য টাকা লাগবে বা কী করতে হবে। যে যে ডকুমেন্ট চাওয়া হয়েছে, আমি সবই দিয়েছি। কিন্তু এই ধরনের কোনো ই-মেইল আমি পাইনি—না সুইডেনের পোর্টাল থেকে, না বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
তিনি জানান, “বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ছিল শুধু নিশ্চিত করা যে ডকুমেন্টগুলো তাদের ইস্যু করা এবং সঠিক। এরপর যদি কোনো ফি প্রয়োজন হয়, সেটি আমাকে জানানো উচিত ছিল। কিন্তু আমাকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এখন আমি না জানলে কীভাবে ব্যবস্থা নেব?
তবে ভেরেফিকেশনের দায়িত্বে থাকা ঢাবির ডেপুটি রেজিস্ট্রার মিসেস নাবিলা নূর উস সাবা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যারা বিদেশ থেকে ডিগ্রি ভেরিফিকেশন করে তাদের একটি নিদ্দির্ষ্ট ফি দিতে হয়—এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আয়। এটা সবার জন্য প্রয়োজন। এটার শুরু হচ্ছে একদম ৩৫-৪০ বছর আগে থেকে। যেমন ৩৫ বছর আগে ছিল ১০ ডলার, তারপরে ৩০ বছর আগে ১৫ ডলার, তারপরে ২০ বছর আগে ছিল ৩০ ডলার, ১৭ বছর আগে ৫০ ডলার করা হয় ।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাদেরকে ডিগ্রি প্রদান করে যেমন মেডিকেলের স্টুডেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাফিলিয়েটেড বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ক্যান্ডিডেট বা আমাদের এক্স স্টুডেন্ট (সাবেক শিক্ষার্থী) যারা বাইরে উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ইমিগ্রেশন অথবা এই ধরনের কোনো প্রয়োজনে কাগজপত্র সত্যায়িত করার জন্য ওরা থার্ড পার্টিকে দেন। হতে পারে ওই ছাত্রী থার্ড পার্টিকে দিয়েছেন—ধরলাম ইন্ডিয়ান কোনো কোম্পানিকে দিয়েছে বা আমেরিকান কোনো কোম্পানি বা সুইডিশ কোনো কোম্পানি বা বিভিন্ন কোম্পানিকে দিয়েছেন। তখন ওই ভেন্ডর কোম্পানিগুলা আমাদের কাছে ই-মেইল পাঠায় এবং ভেরিফিকেশনের জন্য ওরা একটা পেমেন্ট করে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আজ শুক্রবার (২৭ মার্চ) নিজ দপ্তরে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আগামী রবিবার অফিস খুললে আমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা থেকে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।