এক টুকরো স্বর্গ, এক পশলা বৃষ্টি

১৫ জুন ২০২৬, ১১:২৭ AM
জলকেলিতে মেতেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী

জলকেলিতে মেতেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী © টিডিসি ফটো

কাঠফাটা তপ্ত রোদে যখন চারপাশ অস্থির, চাতক পাখির মতো চেনা ক্যাম্পাস যখন আকুল হয়ে এক পশলা ঝুম বৃষ্টির অপেক্ষা করছে, ঠিক তখনই প্রকৃতির মঞ্চে ঘটে এক জাদুকরী পরিবর্তন। হঠাৎ আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা, আর তার বুক চিরে তীব্র আলোর ঝলকানিতে বিদ্যুৎ যেন ঘোষণা দেয় অবাধ্য বারিধারার আগমনী বার্তা। আর সেই মেঘলা রূপের জীবন্ত সাক্ষী যদি হন সাভারের বুকে প্রকৃতির পরম যত্নে গড়া নৈসর্গিক জাদুঘর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, তবে আপনি নিঃসন্দেহে মুগ্ধ বিস্ময়ে বলে উঠবেন- ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বৃষ্টি বুঝি ঝরে এই ক্যাম্পাসের বুকেই!’

বৃষ্টি নামার ঠিক আগের মুহূর্তটি এখানে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চের নাম। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের মাথার ওপর জেগে থাকা অন্ধকার আকাশে বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানিকে মনে হয় যেন মেঘের খাপ থেকে বেরিয়ে আসা কোনো সোনালি তলোয়ার, যা ছুঁয়ে যাচ্ছে দিগন্তের শেষ রেখা। মেঘের গুরুগুরু গর্জনে আর কালো ছায়ায় মুহূর্তেই ঢেকে যায় চিরচেনা পথ, প্রান্তর আর পরিচিত সবুজ। তারপর আর কোনো অপেক্ষা নয়- আকাশ ভেঙে নামে ঝুম মুষলধারে বৃষ্টি।

ক্লাস শেষ করে ভবনের কার্নিশে ব্যাগ আর জুতো জোড়া সঁপে দিয়ে, বৃষ্টির সেই প্রথম জলের স্পর্শে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার যে আদিম আনন্দ, তা থেকে জাবির কোনো শিক্ষার্থীই নিজেকে বঞ্চিত করতে চায় না। হলের চার দেয়াল ছেড়ে মেয়েরা তখন দলে দলে ছুটে আসে চৌরঙ্গী মোড়ে। বৃষ্টির মাতাল করা ছোঁয়ায় বান্ধবীদের হাত ধরে গোল হয়ে ঘোরার সেই চেনা দৃশ্য যেন এক চিরন্তন উৎসব। পায়ের নিচে জমে থাকা জলরাশিতে যখন তারা মেতে ওঠে জলকেলিতে, পানির সেই ঝমঝম শব্দে মনের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা শৈশব আর কোনো বাঁধন মানতে চায় না।

ক্যাম্পাসের জলস্নাত পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আপনি পৌঁছে যান দুপাশে সবুজে ঘেরা রূপকথার সরু পিচঢালা পথ ‘হ্যাভেন রোডে’। সেখানে গাছের পাতার ফাঁক গলে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটা মনে হয় প্রকৃতির নিঃশব্দ প্রার্থনা। এই নিঝুম পথে হাঁটলে মনে হয় পৃথিবীর সব কোলাহল অনেক দূরে, আর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক নিখুঁত শান্তির ভেতর।

অন্যদিকে, সমস্ত ক্লান্তি ভুলে ছেলেরা তখন মেতে ওঠে খেলার মাঠের কর্দমাক্ত ফুটবলে। চারপাশের হরেক রকমের ফুল আর ফলের গাছগুলো যেন নতুন জীবন ফিরে পায়; প্রতিটি পাতা ধুয়েমুছে তার হারিয়ে যাওয়া সজীবতা ফিরে পায় দ্বিগুণ আবেগে।

বাইরে যখন অবিশ্রান্ত ধারায় জল পড়ে, হলের বদ্ধ রুমে তখন শুরু হয় আরেক উৎসব। এমন উত্থাল-পাতাল বৃষ্টির দিনে রুমমেটরা মিলে খিচুড়ি রান্না আর ডিম ভাজার তোড়জোড় শুরু করি আমরা। পাতিলে চাল-ডাল ফোটার সেই সুঘ্রাণ আর বাইরের বৃষ্টির গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। অদ্ভুত এক জাদুবলে অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে এই বৃষ্টির দিনের খিচুড়ির স্বাদ যেন অমৃতের মতো লাগে! খাওয়া শেষে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে যখন বারান্দার গ্রিল ঘেঁষে বসা হয়, তখন বন্ধুদের সঙ্গে জমে ওঠে এক বিশাল রূপকথার আড্ডাখানা। একদিকে গাছের পাতায় বৃষ্টির অবিরাম নূপুরধ্বনি, অন্যদিকে বন্ধুদের উচ্চকণ্ঠের হাসি-ঠাট্টা, এ যেন প্রকৃতির শব্দের সঙ্গে আমাদের কথার এক মধুর প্রতিযোগিতা।

কখনো কখনো আবার আকাশ ভেঙে মুষলধারে নয়, বরং সারাদিন ধরে অলস, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরতে থাকে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে। তখন চায়ের কাপে চামচ নাড়ার টুংটাং শব্দ আর শিক্ষার্থীদের হাজারো গল্পের গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে ওঠে নতুন কলা ভবনের সংলগ্ন চিরচেনা মুরাদ চত্বর।

বৃষ্টিভেজা সেই উদাসীন ক্ষণে লাল ইটের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ আর মুক্তমঞ্চের চত্বর যেন জল-কান্নায় ধুয়েমুছে আরও গাঢ়, আরও রক্তিম লাল বর্ণ ধারণ করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

এমন ভারী বর্ষার দিনে জাবির চিরন্তন রূপটি ফুটে ওঠে অন্য আবহে। হল থেকে মেয়েরা লাল-নীল শাড়ি পরে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ে লাল মাটির রাস্তায়। মেঘলা দিনের স্নিগ্ধ আলোয় নিজেকে তারা খুঁজে নেয় কোনো এক প্রাচীন কাব্যে লেখা কবির বৃষ্টিস্নাত অপ্সরা নারীরূপে। আর দূর থেকে প্রিয়জনেরা পরম ভালোবাসায় ফ্রেমবন্দি করে রাখে সেই জলছাপ জড়ানো রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো।

ঠিক তখনই রাস্তার মোড়ে কোনো এক কদম গাছের হলুদ-সাদা বাহারে চোখ আটকে যায়, চলার পথ থমকে দাঁড়ায় এক মুহূর্তের জন্য। মনটা অবাধ্য হয়ে ওঠে—ইচ্ছে করে ওই ভেজা ডাল থেকে একগুচ্ছ কদম পেড়ে এনে ভালোলাগার মানুষটির হাতে আলতো করে তুলে দিয়ে তাকে চমকে দিতে। আর ক্যাম্পাসের এই মায়াবী হাওয়ায় আপনি ঠিক তা-ই করবেন। অতঃপর সেই কদমগুচ্ছ নিয়ে… ওয়েট ওয়েট, আপনার কি মনে পড়ে গেছে ব্লু জিন্সের সেই গান-‘এক গুচ্ছ কদম হাতে, ভিজতে চাই তোমার সাথে’? 

শুধু কদম ফুলই নয়, নুয়ে পড়া বেগুনি রঙের জারুল ফুল আর বেলি ফুলের মোহনীয় গন্ধে ভরে ওঠে ক্যাম্পাস। লেক, বিল, দিঘি সব জলাশয় পানিতে টইটম্বুর হয়ে গোলাপি, সাদা আর বেগুনি পদ্মফুলে ভরে ওঠে। মনে হয় প্রকৃতি নিজেই রঙের উৎসব শুরু করেছে এই ক্যাম্পাসজুড়ে।

হৃদয়ে প্রেম, স্মৃতি আর ভাবনা নিয়ে এই বৃষ্টি নিয়ে রচিত হয়েছে কত গল্প, চিঠি, কবিতা, উপন্যাস। কখনোবা বিরহের সুরে কবি নজরুল লিখেন—

‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে,
বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে।’

ক্যাম্পাসের এই বাদল দিনে কোথাও এক চিলতে বিরহ থাকলেও দিনশেষে তা রূপ নেয় এক পরম প্রাপ্তিতে। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় যখন হলগুলোর বাতি একে একে জ্বলে ওঠে, দূর থেকে ভেসে আসে কোনো এক গিটারের পরিচিত সুর আর তারুণ্যের কণ্ঠ—‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন…’। তখন মনে হয়, এই লাল মাটির ক্যাম্পাস যেন এক টুকরো মেঘমল্লার রাগ, যা কেবল জাবিয়ানদের জন্যই তৈরি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই সোনালী দিনগুলো একসময় শেষ হয়ে যায়। ক্যাফেটেরিয়া, ট্রান্সপোর্টের বাস কিংবা লাল ইটের চিরচেনা করিডোরগুলো একসময় অতীতে রূপ নেয়। কিন্তু থেকে যায় এই বৃষ্টির দিনগুলো। নাগরিক ব্যস্ততার কোনো তপ্ত দুপুরে কিংবা যান্ত্রিক শহরের বদ্ধ ঘরে বসে যখন হঠাৎ মেঘের ডাক শোনা যায়, মনটা ঠিকই ছুটে চলে যায় সাভারের সেই অরণ্যঘেরা আঙিনায়। স্মৃতির জানালায় কড়া নেড়ে যায় সেই মুরাদ চত্বরের চা, হ্যাভেন রোডের নিস্তব্ধতা আর কদম হাতে ভেজার অমলিন স্মৃতি।

জাবির বর্ষা তাই শুধু ঋতু নয়, এ যেন এক কাব্যিক অনুভূতি। এখানে বৃষ্টি মানে শুধু আকাশ থেকে পড়া জলবিন্দু নয়, বরং স্মৃতির গভীরে গেঁথে যাওয়া এক চিরকালীন মুহূর্ত, যা বছরের পর বছর ধরে বুকের ভেতরে বৃষ্টির মতো ঝরতেই থাকে। ক্যাম্পাস ছাড়ার বহু বছর পরও প্রতিটি বর্ষায় জাবিয়ানদের মন অবলীলায় গেয়ে ওঠে-“আমাদের এই বৃষ্টিভেজা ক্যাম্পাস, আমাদের এক টুকরো স্বর্গ।”

-শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বাবার পরিশ্রম-সততা ছিল অনুপ্রেরণা, আনসার সদস্যের ছেলে বিসিএ…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপপরিচালক নিয়োগ
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
জাবির নারী শিক্ষার্থীকে ধাক্কা, সেলফি পরিবহনের ৬ বাস আটক
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
ইউআইইউ রেসকিউ রোভার টিমের ‘রোবোকাপ রেসকিউ লিগ ২০২৬’ -এ গৌরব…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
‘অফিসের লোক’ পরিচয়ে মিরসরাইয়ে বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার চুরির…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-বরাদ্দে নতুন নিয়ম শিক্ষকদের অ্যাকাডে…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence