সেমিনারটি আইন বিভাগের ১৩৯ নম্বর কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় © টিডিসি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মানবাধিকার রক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার: নৈতিক ও আইনি প্রভাব’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (৪ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ১৩৯ নম্বর কক্ষে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. জুলফিকার আহমেদ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সাঈদা আঞ্জু।
সেমিনারে অধ্যাপক সাঈদা আঞ্জু বলেন, আইন বিভাগের জন্য এটি গর্বের বিষয় যে বিভাগ কর্তৃক প্রেরিত উইনডো ১, ২, ৩, ৪, ৫-এর মধ্য থেকে উইনডো ৩, অর্থাৎ HEAT প্রজেক্টটি আইন বিভাগ পেয়েছে। এই প্রেজেক্টের মাধ্যমে বিভাগের রিসার্চের সংস্কৃতি চালু হবে এবং বিভাগের নাম সুনাম এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য হচ্ছে কীভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-কে বাংলাদেশের জুডিশিয়াল সিস্টেমে অনন্তর্ভুক্ত করা যায়।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমানে এআই-এর ব্যবহার এতই ব্যাপক যে আমরা একটি টাইটেল লিখতেও এআই ব্যবহার করি। এআই-এর ব্যবহার কমানো সম্ভব নয়। তাই আজকে ‘না’ বলা যাবে না, এআই-কে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। কিন্তু এটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রেগুলেশন তৈরি করতে হবে। এই আইন এবং রেগুলেশনগুলো ‘টেস্টিং কিট’ হিসেবে কাজ করবে। এআই-কে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না এটা নিশ্চিত করার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, অনেক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টটি অর্জন করেছে। এটি সত্যিই গর্বের বিষয়। এমন একটি সমসাময়িক ও সময়োপযোগী গবেষণা প্রকল্প পাওয়া প্রমাণ করে যে বিভাগটির অ্যাকাডেমিক মান, গবেষণা সক্ষমতা এবং শিক্ষকবৃন্দের নেতৃত্ব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত। তাই আইন বিভাগ এবং HEAT টিম নিঃসন্দেহে আন্তরিক প্রশংসার দাবিদার।
তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক বিষয়ের ওপর গভীর গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি কেবল একটি প্রজেক্ট নয়; বরং আইন শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের একটি পদক্ষেপ। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থা, ডাটা বিশ্লেষণ, নৈতিকতা ও আইনি জটিলতার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— সে প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী।
গবেষণা জরিপে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন বলেন, ছাত্র-ছাত্রী ও প্রশিক্ষণার্থীরা যারা শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি গবেষণা জরিপের কাজে যুক্ত হয়েছে, তারা নিঃসন্দেহে একটি সঠিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অ্যাকাডেমিক জীবনে গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ভবিষ্যৎ পেশাজীবনে আত্মবিশ্বাস, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং যুক্তি নির্মাণের দক্ষতা বাড়ায়। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রিসার্চের হাতেখড়ি হবে, তারা তথ্য সংগ্রহ, ডাটা বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন লেখা এবং নৈতিক গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। সব মিলিয়ে, এটি আইন বিভাগের জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অসাধারণ শেখার সুযোগ। আশা করা যায়, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় গবেষণা কার্যক্রমের পথ খুলে দেবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক জুলফিকার আহমেদ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কীভাবে মানবাধিকার, নৈতিক অধিকার, মৌলিক অধিকার এবং সাংবিধানিক অন্যান্য অধিকার রক্ষায় ব্যবহার করতে হবে এবং কীভাবে অপরাধী, সাইকো, পুঁজিবাদী সরকার বা দেশের এআই ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেটার জন্য আইন এবং নিয়ম-কানুন তৈরি করা এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য।
‘কৃত্রিম বুদ্ধিমতার সীমাবদ্ধতা দূর করা, এআই-কে কতটুকু পরিমাণ ব্যবহার করা এথিকাল, সেটা নির্ধারণ করা এবং এটার ব্যবহার নিশ্চিত করা, পক্ষপাতদুষ্টতা রোধ করা, নৈতিকতা যেখানে পরাজিত সেখানে আইনকে তখন হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করা, ডাটার গোপনীয়তা নিশ্চিত করা, অ্যালগরিদমের স্রোত বন্ধ করার পরিবর্তে রেগুলেশনের মাধ্যমে বাঁধ তৈরি করা ইত্যাদি এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। ইউরোপে ২০২৩ সালে ইউরোপিয়ান এআই আইন, ২০২৩ নামক কৃত্রিম বুদ্ধিমতার ওপর আইন তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশে জাতীয় এআই স্ট্রাটেজি ২০২৪-৩০ প্রণয়ন করা হয়েছে।’, অধ্যাপক জুলফিকার বলেন।
আইন বিভাগে এআই-এর উপর কোর্স চালু করার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ এই প্রজেক্টের মাধ্যমে মাস্টার্সে একটি স্বতন্ত্র কোর্স চালু করার উদ্দেশ্য নিয়ে আগাচ্ছি। আশা করি, আইন বিভাগ পরবর্তী বছরে মাস্টার্সে কোর্সটি চালু করতে পারব। এটা সফল হলে উক্ত বিভাগ পুরো দেশে পথপ্রদর্শক ডিপার্টমেন্ট হবে। প্রজেক্টটি সফল হলে আইন বিভাগের লিগ্যাল ডাটাবেজ তৈরি হবে, সফটওয়্যার তৈরি হবে, ল্যাব তৈরি হবে যেটা ম্যুট কোর্টের সাথে কানেক্টেড থাকবে এবং এআর এবং ভিআর-এর মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম ও অধ্যাপক ড. মোর্শেদুল ইসলাম।