রাবির ‘বিজয় ৭১’ হল

ছাদ ধসের পর এবার উদ্বোধনের আগেই ফাটল, নির্মাণে ‘বালিশ কাণ্ডের’ সেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

০৪ জুন ২০২৬, ০৩:১৪ PM , আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৪:৪১ PM
রাবির বিজয় ৭১ হলে ফাটল দেখা দিয়েছে

রাবির বিজয় ৭১ হলে ফাটল দেখা দিয়েছে © টিডিসি সম্পাদিত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শেরে বাংলা ফজলুল হক হল ও মন্নুজান হলকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেরেবাংলা হলের কিছু শিক্ষার্থীকে নির্মাণাধীন ১০ তলা আবাসিক ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে উদ্বোধনের আগেই নির্মাণাধীন এ ভবনের বিভিন্ন দেওয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা গেছে।

এছাড়া ফাটল মেরামতের পরও পুনরায় পলেস্তারা খসে পড়ছে। এতে সেখানে অবস্থানরত আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভবনটির নির্মাণের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নির্মাণাধীন হলটির মিলনায়তনের ছাদ ঢালাইয়ের সময় ধসে পড়ে। ওই ঘটনায় অন্তত ৯ জন আহত হয়েছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন ১০ তলা আবাসিক হল এবং ২০ তলাবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ করেছে রূপপুরের ‘বালিশ-কাণ্ডে’ আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। এর মধ্যে ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ১০ তলা আবাসিক হল এবং ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ২০ তলাবিশিষ্ট বিজ্ঞান ভবন।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন দুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। নির্মাণাধীন এ দুই ভবনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালামালবাহী ট্রাকের চাপায় হিমেল নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।

নির্মাণাধীন ১০ তলা আবাসিক হল এবং ২০ তলাবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ করেছে রূপপুরের ‘বালিশ-কাণ্ডে’ আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। এর মধ্যে ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ১০ তলা আবাসিক হল এবং ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ২০ তলাবিশিষ্ট বিজ্ঞান ভবন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন দুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

প্রায় ২৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এ আবাসিক হলে প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হলটিতে রয়েছে চারটি আধুনিক লিফট, একটি বৃহৎ মসজিদ এবং প্রায় ৩০০ আসনবিশিষ্ট আধুনিক অডিটোরিয়াম। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বিতীয় তলায় থাকছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ইনডোর গেমস রুম, জিমনেসিয়াম ও রিডিং রুম। নিচতলায় রাখা হয়েছে গ্রিন জোন এবং স্থায়ী দোকানের ব্যবস্থা।

জানা গেছে, পূর্ববর্তী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলটির নাম নির্ধারণ করেছিল ‘শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান হল’। তবে জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে এটি ‘সাকিব-রায়হান হল’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলটির চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করে ‘বিজয় ৭১ হল’।

এদিকে প্রায় ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক এ আবাসিক হল গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক এস. এম. ওবায়দুল ইসলাম। তবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া হলটির সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানো হলেও পাঁচ বছরেও তা পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হল সংসদের সহবিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক শাহরিয়ার হাসান বলেন, ‘শেরেবাংলা হলে ফাটল দেখা দেওয়ায় আমাদের অস্থায়ীভাবে নতুন হলে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এখানে এসেও বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাচ্ছি। এটি নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী ও হল সংসদের নির্বাহী সম্পাদক শাহিব বিল্লাহ বলেন, ‘পুরোনো হলে ফাটল দেখা দেওয়ায় নিরাপত্তার জন্য আমাদের নতুন হলে স্থানান্তর করা হয়েছে। অথচ উদ্বোধনের আগেই এখানেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্মাণকাজে গাফিলতি ও ত্রুটি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানাই।’

হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ, রাবি শাখার সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘নতুন হলে আসার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাচ্ছি। এমনকি মেরামতের পরও পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি।’

বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মিনহাজুল আলম বলেন, ‘ফাটলগুলো মূলত তাপমাত্রাজনিত কারণে হয়ে থাকতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো কেটে পরীক্ষা করে দেখব। তবে এগুলো মেরামতযোগ্য এবং আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক এস. এম. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বিম ও দেয়ালের সংযোগস্থল কিংবা ভিন্ন অংশে করা প্লাস্টারের কারণে এ ধরনের ফাটল দেখা দিতে পারে। তবে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ইতোমধ্যে প্রকৌশলীদের একটি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।’

আরও পড়ুন: এনটিআরসিএর সুপারিশে নিয়োগ, তবুও বেতনহীন ১২০০ শিক্ষক

হলের কাজের ধীরগতি, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির একটি ফেসবুক পোস্ট দেন। তাঁর ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কি পরিমাণ দূর্নীতি হয়েছে তা নির্মাণাধীন দুইটি আবাসিক হল এবং একটি একাডেমিক ভবনের নির্মাণ কাজের দিকে তাকালেই বুঝা যায়।

তিনি আরও বলেন, ফাঁটল ধরা বিজয়-৭১ হলের কাজ সম্পন্ন করে হস্তান্তর করার কথা ছিল আরও আগে। কিন্তু ইচ্ছা করেই তা করা হয়নি। এর আগেও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হলটির অডিটোরিয়ামের ছাদ ভেঙ্গে পড়ে প্রায় ১০-১২ জন আহত হয়। ওই সময়ই হলের নির্মাণ কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের জন্য ঠিকাদার জবাবদিহিতাকে পাশ কাটিয়ে যায়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাপু প্রশাসনের মৌখিক চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত বছরের ডিসেম্বরে হলের কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি তৎকালীন আমলে ঠিকাদারের সাথে প্রশাসনের মৌখিক কিছু চুক্তির কারণে। যা কাগজে কলমে লিখা ছিল না। এখন সেই কাজগুলো সম্পন্নের জন্য ঠিকাদার মৌখিক চুক্তির টাকা চাইলে বর্তমান প্রশাসন তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। স্বভাবতই, মৌখিক কোন চুক্তির টাকা বর্তমান প্রশাসন ঠিকাদারকে কেন দিবে? এটা তো অবৈধ কাজ। এই টাকা না পাওয়ায় ঠিকাদার কাজও আটকিয়ে দিয়েছে।’

‘কোন যদি-কিন্তু ছাড়া এইসব দূর্নীতিগুলোর তদন্ত করে জড়িতদের বিচারের সম্মুখীন করতে না পারা’- সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. সালেহ হাসান নকীব প্রশাসনের অন্যতম বড় ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া বর্তমান প্রশাসনকে এইসব বিষয়ে দৃষ্টিপাত করার এবং তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত দুটি হল পরিদর্শন শেষে নতুন হল প্রসঙ্গে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর আমরা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলের ঝুঁকির মাত্রা নিরূপণ করব। পরবর্তীতে তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্মাণাধীন নতুন হলের কাজে কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হলটির উদ্বোধন কবে হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘উদ্বোধনের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। এখন নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তবে কাজ দ্রুত শেষ করার নামে কোনো ধরনের গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না।’

বিষয়টি নিয়ে চেষ্টা করেও নির্মাণে যুক্ত রূপপুরের ‘বালিশ-কাণ্ডে’ আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’র কারও বক্তব্য জানান সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি ১০ তলা হলের সামনে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে ভবনটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এর আগে ২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

সরকারি ত্রাণ দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে বিতরণ, বিএনপির ২ নেতার …
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
খাগড়াছড়িতে পাহাড় কাটায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
রথযাত্রা থেকে ফিরে বাসায় মিলল নারীর বস্তাবন্দি মরদেহ
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
৩ মাসের শিশুর পা ভেঙে দেওয়া সেই চাচি গ্রেফতার
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
ঝিনাইদহে ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের মৃত্যু
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছরে বহুতল ভবন থেকে পড়ে ৩ শ্রমিকে…
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence