টিডিসি সম্পাদিত © টিডিসি
জামালপুর শহরে তীব্র গ্যাস সংকটে আবাসিক হল ও ছাত্র মেসগুলোয় রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। নিয়মিত খাবার জোগাড় করতে না পেরে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের পানাউল্লাহ আহমেদ হলসহ বিভিন্ন মেসের অনেক শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরছেন। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গ্যাস সংকটে দুর্ভোগে পড়েছেন শহরের হাজারো পরিবার, সিএনজিচালক ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরাও।
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার (১৫ আগস্ট) বিকেল পর্যন্ত শহরের একমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন চালকেরা। একই সময়ে শহরের সিংহভাগ বাসাবাড়িতেও টানা তিন দিন দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে যায়। ফলে খাবার, যাতায়াত ও জরুরি সেবায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের নাগরিক সংকট।
সারা দেশের গ্যাস সংকটের তীব্র প্রভাব এবার ছড়িয়ে পড়েছে জামালপুরে। জেলায় কোনো শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ না থাকলেও শহরের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে বাসাবাড়ির সংযোগ। গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার টানা দুই দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো পূর্বঘোষণা বা মাইকিং ছাড়াই শহরের সিংহভাগ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ।
গ্যাস না থাকায় বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ হয়ে যায়। কেউ চড়া দামে হোটেল থেকে খাবার কিনেছেন, আবার কেউ এলপিজি ও সিলিন্ডার স্টোভ ব্যবহার করে অতিরিক্ত খরচ সামলানোর চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে জেলার একমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ না থাকায় পরিবহন খাতেও দেখা দিয়েছে চরম সংকট।
গ্যাস সংকটে শিক্ষার্থীদের খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা
শহরের গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীদের ওপর। কলেজের পানাউল্লাহ আহমেদ হলে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী থাকেন। সেখানে একসঙ্গে শিক্ষার্থীদের রান্না করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে গ্যাসের সংকটে ঠিকমতো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নিয়মিত খাবার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
আরও পড়ুন: অনার্স পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
হলের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন ছাত্র মেসেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রান্নার ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে অনেককে। এতে বাড়ছে দৈনন্দিন খরচ। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ।
পানাউল্লাহ আহমেদ হলের শিক্ষার্থী ফয়সাল রানা বলেন, ‘কিছুদিন ধরে বিদ্যুৎ সমস্যা আছে। তাও কষ্ট করে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু গ্যাসের সমস্যা কীভাবে মেনে নেব? আমরা হলে তিন বেলা খাই, খাবারের জন্য প্রায় ১০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বাইরে এক বেলাতেই ১০০ টাকা লাগে। আমরা প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত ও গরিব ঘরের সন্তান। এখন খাবারের সমস্যা হচ্ছে। এজন্য অনেকেই আস্তে আস্তে হল ছেড়ে বাসায় চলে যাচ্ছে।’
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, শহরে থেকে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে আবাসিক হল ও মেসের কম খরচের খাবারের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হয়। কিন্তু কিছুদিন যাবত গ্যাস সংকট চললে বাড়তি খাবারের খরচ বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এতে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন।
বিপাকে জরুরি সেবা, গ্যাসের চিন্তায় থমকে অ্যাম্বুলেন্স
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতিতে পড়েছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা ও স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালকেরা। রোগী বহনকারী কিংবা জরুরি ট্রিপে থাকা অ্যাম্বুলেন্স পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে।
পাম্পের সামনে অপেক্ষারত অ্যাম্বুলেন্সচালক বাঁধন মিয়া বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে জামালপুরে রোগী নিয়ে আসছি। এখন গাড়িতে যে গ্যাস আছে, তা দিয়ে ফেরত যাওয়া সম্ভব না। গ্যাস পাওয়ার আশায় বৃহস্পতিবার রাতে এখানে আসছি। এরপর থেকে পাম্পের সামনে বসে ও শুয়ে আছি। গ্যাস পেলে তো অতদূর যেতে পারব। গ্যাসই যদি না থাকে, আমরা যাব কীভাবে? মালিক ফোন দিচ্ছে কখন যাব। আমি মালিককে জানিয়েছি, গ্যাস ছাড়া তো আর যেতে পারব না।’
রাত কাটিয়েও গ্যাসের অপেক্ষায় চালকেরা
সিএনজিচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে পাম্পটিতে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সামান্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর গ্যাসের চাপ কমে গেলে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পুরো রাত, সকাল পেরিয়ে শুক্রবার বিকেল হলেও গ্যাসের দেখা মেলেনি।
শনিবার ভোর ৪টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি চালক আব্দুল মালেক বলেন, ‘ভোর চারটার সময় বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হইছি। এখনো পাম্পের লাইনে বসে আছি। গাড়ি রাস্তায় রেখে তো আর বাড়িতে যাওয়া যাবে না। দুপুর হয়ে গেল, এক টাকাও আয় করতে পারলাম না। উল্টো দেড়শ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমাদের মতো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের তো আর কিছু করার নেই।’
বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ
পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে থাকা এবং পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার কারণে সড়কে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
গ্যাস সংকটের কারণে রাস্তায় ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে যানবাহনের সংখ্যাও কিছুটা কম দেখা গেছে। সাধারণত যে রুটে ৩০ টাকা ভাড়া, সেখানে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শহরের বাইপাস মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাজু নামে এক যাত্রী বলেন, ‘গ্যাসের দোহাই দিয়ে চালকেরা কিছুটা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। আজকে গাড়িও অনেক কম দেখা যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই আমাদের পকেট থেকে বাড়তি টাকা খসাতে হচ্ছে।’
বাসাবাড়িতে টানা দুই দিন চুলা বন্ধ
পাম্পের জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি শহরের বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গৃহিণীরাও। শহরের ৫ রাস্তা এলাকার বাসিন্দা পাপিয়া আফরিন বলেন, ‘গতকাল সকালে উঠে দেখি গ্যাস নেই। সন্ধ্যার পর এসেছিল। আজকেও সকালে উঠে দেখি গ্যাস নেই। কখন আসবে জানি না। কত দিন গ্যাস থাকবে না, সে বিষয়েও আমাদের কোনো ধারণা নেই। তিতাসের উচিত ছিল আগে থেকে মাইকিং করে জনসাধারণকে বিস্তারিত জানানো। তাহলে আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারতাম।’
প্রতিদিন চলে প্রায় ৫ হাজার সিএনজি
বিআরটিএ নিবন্ধিত ও বাইরে থেকে আসা মিলিয়ে জামালপুরে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশা এবং বিপুলসংখ্যক গ্যাসচালিত যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু পুরো জেলায় গ্যাস নেওয়ার একমাত্র ভরসা জাবেদ ফিলিং স্টেশন। পাম্পটিতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি।
জাবেদ ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আতিক রহমান বাবর বলেন, ‘গ্যাসের এই সংকট শুধু আমাদের এখানে নয়, সারা বাংলাদেশেই এই সংকট। গ্রিড থেকে আমরা যেভাবে গ্যাস পাই, সঙ্গে সঙ্গেই তা গ্রাহকদের দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের পাম্পের মেশিনে কোনো ত্রুটি নেই। লাইন থেকে প্রেসার পেলেই আমরা সবাইকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ করে দিচ্ছি।’
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জামালপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ম্যানেজার দুর্জয় খকসী বলেন, ‘মূল সরবরাহ লাইনে কোনো গ্যাস না থাকায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’
জামালপুর জেলায় তিতাস গ্যাসের মাসিক চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার।