৫৬ বছরে, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের জ্ঞানভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। লাল ইটের নান্দনিক স্থাপনা, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শিক্ষায় উৎকর্ষতার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠকাল থেকেই নিজস্বতা ধরে রেখেছে।

আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ৫৫ পেরিয়ে ৫৬ বছরে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষা-সংস্কৃতি, গবেষণা, ও জাতি গঠনে এই বিদ্যায়তনের অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। মোঘল আমলে বাংলার রাজধানী ‘জাহাঙ্গীরনগর’ থেকে এর নামকরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালে নাম ছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণীত হওয়ার পর ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

প্রায় ৬৯৭.৫৬ একর আয়তনের বিশাল এই ক্যাম্পাসের উত্তরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, উত্তর-পূর্বে সাভার সেনানিবাস, দক্ষিণে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি) এবং পূর্বে কেন্দ্রীয় ডেইরি ফার্ম অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বরাবর চলে গেছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক।

১৯৭০-৭১ শিক্ষাবর্ষে মাত্র ৪ টি বিভাগে ১শত ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। শুরুর দিকের বিভাগগুলো: গণিত, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি ও ভূগোল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউট রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বমানের গ্রন্থগার, ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র, ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, আইসিটি সেল, মানব সম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র, ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এস্যুরেন্স সেল, বিজ্ঞান কারখানা।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা। দেশের প্রথম নৃবিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশের একমাত্র প্রত্নতত্ত্ব বিভাগটিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। বর্তমানে নির্মাণাধীন ছয়তলা আধুনিক গ্রন্থাগারটি সম্পন্ন হলে এটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রন্থাগার, যেখানে একসঙ্গে ৭ থেকে ৮ হাজার শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা থাকবে। ক্যাম্পাসে অবস্থিত ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রটি দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান গবেষণা স্থাপনা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ‘বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবেও পরিচিত। ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে প্রায় ২৬টি ছোট-বড় লেক। লাল শাপলা, পদ্ম ও নানা জলজ ফুলে ভরা এসব লেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি শীতে সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, ভারত ও জিনজিয়াং অঞ্চল থেকে আগত পরিযায়ী পাখিরা এসব লেককে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরিয়ে তোলে। পাখি সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় পাখি মেলা। পাশাপাশি রয়েছে বাটারফ্লাই জোন এবং আয়োজিত হয় বার্ষিক প্রজাপতি মেলা।

৫৬ বছরে পদার্পণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—ঢাকার কোলাহল থেকে খানিক দূরে এক সবুজ, প্রাণবন্ত জ্ঞানভূমি হিসেবে।

দেশের সবচেয়ে উঁচু শহিদ মিনার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। তিন-স্তম্ভ বিশিষ্ট এই শহিদ মিনারের প্রত্যেক স্তম্ভের স্বতন্ত্র স্বকীয়তা আছে। একটি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতীক, আর বাকি দুটি ভূমি ও মানুষ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘সংসপ্তক’, যেখানে হাত-পা হারানো এক মুক্তিযোদ্ধাকে বিজয়ের অস্ত্র উঁচিয়ে ধরতে দেখা যায়। এছাড়া ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নির্মিত ‘অমর একুশে’ ভাস্কর্যও ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত উন্মুক্ত নাট্যমঞ্চটিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। লাল সিরামিক ইটে নির্মিত এই মঞ্চের নামকরণ করা হয়েছে প্রখ্যাত নাট্যকার সেলিম আল দীনের নামে। ভরা শীতে এই মঞ্চ হয়ে ওঠে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সৃজনশীল উপস্থাপনায়  ব্যস্ত থাকে এই মঞ্চ।

আরও পড়ুন: জুলাইযোদ্ধা ঢাবি ছাত্রকে হিজবুত তাহরির দেখিয়ে কারাগারে পাঠাল পুলিশ

বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সব শিক্ষার্থীর আবাসনের নিশ্চয়তা দেয়। বর্তমানে ক্যাম্পাসে ছেলেদের জন্য ১১টি এবং মেয়েদের জন্য ১০টি আবাসিক হল রয়েছে, যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান।

শিক্ষা ও গবেষণায় গত পাঁচ দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। একাধিক শিক্ষক ও গবেষক বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় একাধিকবার স্থান পেয়েছেন। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২৪-এ বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০২৫ ও ২০২৬ সংস্করণে যৌথভাবে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শুধু শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে নয় জাতীয় আন্দোলন-সংগ্রামেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রভাগে ছিল। মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ২০২৪ সালের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই প্রথম ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করেন এবং সরকার ঘোষিত কারফিউ অমান্য করে রাজপথে নামেন। আন্দোলন চলাকালে এই ক্যাম্পাসেই দেশের প্রথম জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।

৫৫ বছরের পথচলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অসংখ্য খ্যাতিমান কবি, লেখক, সাংবাদিক, নাট্যকার, অর্থনীতিবিদ ও ক্রীড়াবিদ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—কবি সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, লেখক হায়াৎ মামুদ ও হুমায়ুন আজাদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন, নাট্যকার সেলিম আল দীন, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আনু মুহাম্মদ, কবি মোহাম্মদ রফিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি, শহীদুজ্জামান সেলিম, জাকিয়া বারী মম, সাজল নূর এবং ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তূজা ও মুশফিকুর রহিম।

৫৬ বছরে পদার্পণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—ঢাকার কোলাহল থেকে খানিক দূরে এক সবুজ, প্রাণবন্ত জ্ঞানভূমি হিসেবে।

আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগেই দুশ্চিন্তায়  স্পেন
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
‘মরব দুজনেই’—ঝাঁপ দিলেন প্রেমিক, ফিরে গেলেন প্রেমিকা!
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
সকালের মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
কুশিয়ারাসহ পদ্মা-যমুনায় পানি বাড়লেও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রামসহ ৫ জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনির্দিষ্টকাল…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
ছাত্রলীগকে ধাওয়া দিল রাবি শিক্ষার্থীরা
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence