জাবি ও শিবিরের লোগো © সংগৃহীত
শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর গত বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। এতে ভূমিধস জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ কেন্দ্রীয় সংসদে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদসহ মোট ২৫টি পদের ২০টিতেই জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির। জাকসু নির্বাচনে এই জয়ের পরেই আলোচনায় এসেছে জাবি শাখা ছাত্রশিবির।
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির প্রকাশ্য রাজনীতিতে থিতু হতে পারেননি। ফলে রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান ছিল না। তারা নব্বই দশকের একদম শুরু থেকে জাবিতে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারেনি এমনকি অনানুষ্ঠানিকভাবে একপ্রকার নিষিদ্ধই ছিল তাদের রাজনীতি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা শাসন আমলের অবসান হলে দীর্ঘ ৩৫ বছরের খরা কাটিয়ে নিরাপদ ক্যাম্পাস, দখলমুক্ত ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের দাবিতে এক বিবৃতি দিয়ে প্রকাশ্যে আসে সংগঠনটি।
একটি বিশ্ববিদ্যালযে ৩৫ বছর রাজনৈতিকভাবে একপ্রকার নিষিদ্ধ থাকা ছাত্রসংগঠনটি প্রকাশ্যে আসার বর্ষপূর্তি না হতেই ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশ আসন নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে ম্যান্ডেট পায়। ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে চলছে আলোচনা।
সংগঠনের বর্তমান কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রকাশ্য রাজনীতিতে তাদেরকে কোণঠাসা করে রাখা হলেও থেমে থাকেনি সাংগঠনিক কার্যক্রম। সরাসরি দলীয় নামে রাজনীতির মাঠ উপযুক্ত না থাকায় তারা গোপন কোডকে সংগঠনের নাম হিসেবে ব্যবহার করতো। নামের বদলে কোড ব্যবহার করে দলীয় কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে ছাত্রশিবিরের এক সাবেক নেতার পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ভাইরাল হয়।
ফেসবুক পোস্টটি হলো, ‘‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ৩৩ বছর নিষিদ্ধ ছিল। এই নিষিদ্ধ সময়ে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করত। তাদের ভার্সিটি কোড ছিল ‘কেজা’! এই নামে তাদেরকে সবাই চিনত। মানে তারা যদি কেন্দ্রীয় কোনো প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করত তাহলে তাদেরকে ‘কেজা’ হিসেবে ডাকা হতো। সেখানে পড়া অবস্থায় কেউ বাইরে ওপেন ছাত্রশিবিরের রাজনীতি করতে পারতো না। ধরা পড়লে তাকেও মারা হতো।’’
পোস্টে আরও বলা হয়, ‘কেজা’ নামটা এক সময় সবাই জেনে গেলে এই নামটা তারা বদলে দেয়। ভার্সিটির নাম কেজা তো ছিলই এরপরে আসেন হলের নামে। প্রতিটি হলের আলাদা কোড ছিল। যেহেতু তারা কর্মীদের কাগজপত্র মেইন্টেইন করে তাই নামও লেখা হতো কোডে। এক হলের শিবির জানতো না আরেক হলের কে শিবির করে! এমনকি হলের মধ্যে একটা ইউনিট জানতো না সেইম হলের অন্য ইউনিট (উপশাখা) শিবির করে! কারণ একজন ধরা পড়লে যাতে আর কারো নাম নিতে না পারে।
‘‘এছাড়া সভাপতি ও সেক্রেটারি সব পদগুলোর একটা করে ইউনিক কোড থাকতো। এই কোড আবার নিয়মিত চেইঞ্জ হতো যাতে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়ে কেউ পরে মতাদর্শ চেইঞ্জ হলে (এবি পার্টির মনজুর মতো) ফাঁস করলেও ধরা যাতে না পড়ে। আর হলের বাইরে যারা থাকতো তাদের একজনের বাসা আরেকজন চিনতো না, সেই মোবাইল যুগের আগের কথা বলছি। নির্দিষ্ট সময়ে সবাই নির্দিষ্ট স্থানে দেখা করত। কারণ একজনকে ধরলে যাতে আরেকজনের বাসা দেখিয়ে দিতে না পারে ‘’
বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের এক কর্মী জানান, ‘কেজা’ কোডের পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো ‘কেন্দ্র জানে’। মূলত ব্যক্তির তথ্য সংগঠনের মূল শাখা বা কেন্দ্রের কাছে রাখা অর্থেই এটি ব্যবহৃত হলে জানান তিনি।
জাকসু নির্বাচনের ফলাফলের পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে শিবিরের ভিপি প্রার্থী আরিফুল্লাহ আদিব বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক জায়গা, যেখানে শিবিরকর্মীদের জীবন দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে অতিথি পাখি হত্যারও বিচার হয়, কিন্তু শিবিরকর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করলেও কেউ বিচার চায় না। আরিফুল্লাহ জানান, শুধু ছাত্রশিবির করার কারণে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে ছাত্রত্ব শেষ না করেই ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছে।
আরিফুল্লাহ আদিব বলেন, ১৯৯৪ সালের ১৬ আগস্ট আমরা হারিয়েছি আমাদের ভাই কামরুল ইসলামকে। তিনি ভর্তি পরীক্ষার ভাইভা দিতে এসে শুধুমাত্র শিবির সন্দেহে পিটুনিতে মারা যান। তিনি আরও বলেন, আরেকজন ভাইকে শুধু শিবির করার কারণে শেখ হাসিনার আমলের পুলিশ গুলি করে পঙ্গু করে দেয়। তবুও এত বাধা, নির্যাতন আর শোকের মধ্যেও ইসলামী ছাত্রশিবির এবার পূর্ণাঙ্গ প্যানেল উপস্থাপন করেছে। সেই প্যানেল থেকেই ২০ জন বিজয়ী হয়েছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।