সোলার প্যানেল © সংগৃহীত
বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে দেশের সাধারণ জনগণ। একদিকে যেমন তীব্র লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি, অন্যদিকে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল। তাই বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে অনেকেরই আগ্রহ বাড়ছে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার প্যানেল বসানোর দিকে। সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনারও ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
এর অংশ হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও বিকল্প জ্বালানির গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর দিনের বিভিন্ন সময়ে জাতীয় গ্রিডে এক থেকে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং ছিল। ওই দিন বিকেল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭১ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ হয় ১২ হাজার ৯৭৩ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট। বিকেল ৪টায়ও ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯৬৩ মেগাওয়াট।
বিদ্যুতের এই চরম সংকটে সোলার প্যানেল কি কার্যকর বিকল্প? আসলে সোলার প্যানেল বসালেই যে বিদ্যুতের বিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে কিংবা লোডশেডিংয়ের সময় সব ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে বিষয়টি এমন নয়। বরং নিজের প্রয়োজন, ছাদের জায়গা, দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং ব্যাটারি কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সোলার কতটা লাভজনক হবে।
আরও পড়ুন: চ্যাটজিপিটিকেই প্রশ্ন—‘চ্যাটজিপিটি কি ডাউন?’ মিলছিল না সাড়া, ৩০মিনিটে অভিযোগ ৭৪ হাজার
সোলার বসালে কী সুবিধা?
সোলার প্যানেল সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি বাড়ির বিভিন্ন যন্ত্র চালাতে ব্যবহার করা যায়। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ নিতে হয় এবং বিদ্যুৎ বিলও কমানো সম্ভব। তবে সোলারের সবচেয়ে বড় সুবিধা পেতে হলে অন-গ্রিড ব্যবস্থা বেশ কার্যকর হতে পারে। এতে বাড়ির সোলার সিস্টেম জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত থাকে। দিনের বেলায় সোলার থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আগে নিজের কাজে ব্যবহার হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া যায় এবং নেট মিটারিংয়ের নিয়ম অনুযায়ী সেটার হিসাব সমন্বয় করা হয়।
বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা ইতোমধ্যে বেশ বিস্তৃত হচ্ছে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) নেট মিটারিং ডেটাবেসে বর্তমানে ৫ হাজার ৬৭টি নেট-মিটার্ড রুফটপ সোলার সিস্টেম তালিকাভুক্ত রয়েছে। এগুলোর মোট সক্ষমতা ৩৬৫ দশমিক ৬৩২ মেগাওয়াট-পিক (এমডব্লিউপি)। অর্থাৎ এটি শুধু সম্ভাবনার কথা নয়; বাংলাদেশে বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনায় নেট-মিটার্ড সোলারের ব্যবহার বাস্তবেই বাড়ছে।
অফ-গ্রিড, অন-গ্রিড সোলার
অফ-গ্রিড বা ব্যাটারি সিস্টেম: এই সিস্টেমে সোলার প্যানেলের সাথে ব্যাটারি যুক্ত থাকে। দিনের বেলা প্যানেল ঘর চালানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করে। রাতে সূর্য না থাকলে সোলার সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ২৪ ঘণ্টা ব্যাকআপ দিতে পারে।
অন-গ্রিড বা হাইব্রিড সিস্টেম
এই ব্যবস্থায় আপনার সোলার সিস্টেম সরাসরি সরকারি বিদ্যুৎ লাইনের (গ্রিড) সাথে যুক্ত থাকে। দিনের বেলা সোলারের বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে চলে যায়। আবার রাতে যখন সোলার বন্ধ থাকে, তখন সরকারি গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ এনে ঘর সচল রাখা হয়।
লোডশেডিংয়ের সময় কি সোলার চলবে?
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। সাধারণ অন-গ্রিড সোলার সিস্টেম লোডশেডিংয়ের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে এমনটা নয়। গ্রিডে বিদ্যুৎ না থাকলে নিরাপত্তাজনিত কারণে সাধারণ অন-গ্রিড ইনভার্টারও বন্ধ হয়ে যায়।
লোডশেডিংয়ের সময়ও ফ্যান, লাইট, রাউটার বা অন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র চালাতে চাইলে অন-গ্রিড সোলার সিস্টেমের সঙ্গে ব্যাটারি রাখতে হবে। এতে সোলার, ব্যাটারি ও জাতীয় গ্রিড তিনটি উৎসকে সমন্বয় করে ব্যবহার করা যায়। তবে ব্যাটারি যোগ করলে সিস্টেমের প্রাথমিক খরচ বেড়ে যায়। তাই শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানোর লক্ষ্য হলে অন-গ্রিড ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম খরচের হতে পারে; আর লোডশেডিংয়ের ব্যাকআপ চাইলে হাইব্রিড ব্যবস্থা বেশি উপযোগী।
সোলার কি বিদ্যুৎ বিলের চেয়ে সস্তা?
এখানে সরাসরি 'সোলারই সস্তা' বলা ঠিক হবে না। কারণ সোলার বসাতে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। প্যানেল, ইনভার্টার, কাঠামো, তার, মিটার, ইনস্টলেশন এবং ব্যাটারি থাকলে তার খরচ সব মিলিয়ে প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারিত হয়।
অন্যদিকে, সোলার প্যানেলের আয়ু তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ। ফলে কয়েক বছর ধরে উৎপাদিত বিদ্যুতের হিসাব করলে প্রাথমিক বিনিয়োগের একটি অংশ ধীরে ধীরে উঠে আসে। তবে কত বছরে খরচ উঠে আসবে, তা সবার জন্য এক নয়। বিদ্যুতের ব্যবহার, দিনের কোন সময়ে বেশি বিদ্যুৎ লাগে, সিস্টেমের আকার, ব্যাটারির ব্যবহার এবং নেট মিটারিংয়ের সুবিধা সবকিছুর ওপর তা নির্ভর করে। তবে বলা যায় বিদ্যুৎ বিল কমাতে বা লোডশেডিং থেকে মুক্তি পেতে সোলার অবশ্যই কার্যকরী বিকল্প।
বিশ্বব্যাপীও সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ দ্রুত কমেছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইরেনা) জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বড় পরিসরের সৌরবিদ্যুতের বৈশ্বিক গড় উৎপাদন ব্যয় প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় প্রায় ৪ দশমিক ৩ মার্কিন সেন্টে নেমেছে। তবে এটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের হিসাব, সরাসরি একটি বাড়ির ছাদে সোলার বসানোর খরচের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।
বাংলাদেশও এগোচ্ছে সোলারের দিকে
সৌরবিদ্যুত ব্যবহার বাড়াতে সরকারও নীতিগতভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালায় সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য উৎসের পাশাপাশি ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রুফটপ সোলার নিয়েও সরকারের আলাদা কর্মসূচি রয়েছে। স্রেডা জানিয়েছে, ভূমির সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রিড-সংযুক্ত ভবনের ছাদে সোলার স্থাপনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫-এর মাধ্যমে গ্রাহকদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও রাখা হয়েছে।
সোলারে বিশ্বে সফল উদাহরণ চীন
সোলারের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি চীন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চীন একাই প্রায় ৩৭০ গিগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত একই বছরে প্রায় ৫০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবারের মতো এক বছরে ৩ গিগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে।
আরও পড়ুন: ফোন নম্বর ছাড়াই হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ, ইউজারনেম সংরক্ষণের সুযোগ
বিশ্বব্যাপীও সৌরবিদ্যুতের বিস্তার দ্রুত হচ্ছে। আইইএর হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বেড়েছে এবং মোট উৎপাদন প্রায় ২ হাজার ৭০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৮ শতাংশের বেশি এখন সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে।
তাহলে কার জন্য সোলার বেশি উপযোগী?
সোলার সবার জন্য একইভাবে লাভজনক নয়। যাদের ছাদে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা আছে, দিনে নিয়মিত বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে, তাদের জন্য অন-গ্রিড সোলার ভালো বিকল্প হতে পারে।
অন্যদিকে, যাদের প্রধান সমস্যা লোডশেডিং, তাদের জন্য ব্যাটারিসহ হাইব্রিড সিস্টেম বেশি কার্যকর। তবে এতে খরচও বেশি। সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সোলারকে জাতীয় গ্রিডের পুরো বিকল্প হিসেবে দেখার চেয়ে গ্রিডের পাশাপাশি একটি বিকল্প বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে বিবেচনা করাই বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে নেট মিটারিংয়ের সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে দিনের অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচও কমানো সম্ভব।