প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
গুগল সার্চে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি সারাংশ বা সংক্ষিপ্ত উত্তরের সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে, যা ‘এআই ওভারভিউ’ নামে পরিচিত। গুগলের দাবি, এতে ব্যবহারকারীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে সময় সাশ্রয় করতে পারবেন। তবে এই সুবিধা চালুর পর থেকেই অভিযোগ উঠছে অনেক ক্ষেত্রে এআই ওভারভিউ ভুল কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখাচ্ছে।
এআইয়ের মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কা নতুন নয়। ২০১৯ সালের শুরুতেই মার্কিন বাণিজ্যভিত্তিক প্রকাশনা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুয়া খবর তৈরি করতে সক্ষম হয়ে উঠছে। ওই প্রতিবেদনে আলোচিত টুলগুলোর একটি ছিল ‘জিপিটি-২’, যা বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত চ্যাটজিপিটির পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে গুগল সার্চের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে এআই। এখন কোনো কিছু সার্চ করলে ফলাফলের পৃষ্ঠার একেবারে উপরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ‘এআই ওভারভিউ’ দেখা যায়, যা ব্যবহারকারীর জন্য তথ্য উপস্থাপনের নতুন এক ফরমেট তৈরি করেছে। তবে এই নতুন ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই উঠছে নানা প্রশ্ন।
বিভিন্ন ওয়েবসাইটও ‘কনটেন্ট মিল’-এর মতো পাইকারি হারে এআই দিয়ে নিবন্ধ তৈরি করে এ সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
তবে আশার কথা, গুগলের কাছে এর একটি সমাধান রয়েছে। গুগলের সেই সমাধানটির নাম ‘প্রেফার্ড সোর্সেস’।
২০২৫ সালের অগাস্টে চালু হওয়া নতুন এই ফিচার ব্যবহারকারীকে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে তথ্য খোঁজার জন্য পছন্দের বিভিন্ন ওয়েবসাইট বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়।
কীভাবে ‘প্রেফার্ড সোর্সেস’ সেট আপ করবেন–
১. গুগল সার্চে গিয়ে আপনার প্রয়োজনীয় বিষয়টি লিখে সার্চ করুন।
২. সার্চ রেজাল্ট বা ফলাফল আসার পর যতক্ষণ না আপনি ‘টপ স্টোরিজ’ সেকশনটি দেখতে পাচ্ছেন ততক্ষণ নিচের দিকে স্ক্রল করুন। ওই লেখাটির পাশেই ‘স্টার’-এর মতো একটি আইকন দেখতে পাবেন। সেটিতে ক্লিক বা ট্যাপ করুন।
৩. এরপর একটি পপ-আপ উইন্ডো আসবে। সেখানে নিজের পছন্দের সংবাদ মাধ্যম বা ওয়েবসাইটের নাম লিখুন। পছন্দের নামগুলো তালিকায় যোগ হয়ে গেলে ‘রিলোড রেজাল্টস’ বাটনে ক্লিক করুন।
সঠিক তথ্যসূত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গত কয়েক বছরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত হওয়ার ফলে তথ্য পাওয়ার ধরন আমূল বদলে গেছে। সার্চ ইঞ্জিন, লেখালেখি, ছবি তৈরি বা সিদ্ধান্ত সহায়তা সব ক্ষেত্রেই এআই ব্যবহারকারীর কাজ দ্রুত ও সহজ করেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি একটি বড় ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে, আর সেটি হলো ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার।
গুগলের ‘এআই ওভারভিউ’ এই সমস্যার একটি বাস্তব উদাহরণ। এটি মূলত এআইয়ের পরিচিত ‘হ্যালুসিনেশন’ সমস্যায় ভুগছে। হ্যালুসিনেশন বলতে বোঝায় এআই যখন বাস্তব তথ্যের ভিত্তি ছাড়াই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক তথ্য উপস্থাপন করে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী সেই তথ্যকে সত্য ধরে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা মারাত্মক বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।
এআইয়ের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো ভাষার সূক্ষ্ম পার্থক্য, প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক অর্থ বোঝার দুর্বলতা। একই শব্দ বা বাক্য ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে কিন্তু এআই অনেক সময় সেই পার্থক্য ধরতে পারে না। পাশাপাশি মানুষের মতো নৈতিক বিচার, বাস্তব অভিজ্ঞতা বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও এআইয়ের সীমিত। ফলে সংবেদনশীল বিষয়, চিকিৎসা, আইন বা রাজনৈতিক তথ্যের ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
‘ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন’ বা ইবিইউ ও বিবিসি পরিচালিত যৌথ এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ভাষা বা ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে বিভিন্ন এআই মডেল ‘নিয়মিতভাবে সংবাদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে’। তাদের বিশ্লেষণ বলছে, এ ভুলের হার ৪৫ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
পাঠকরাও এ ব্যাপারে বেশ সন্দিহান। ৪৭টি দেশে পরিচালিত ‘রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ জার্নালিজম’-এর তদন্তে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ এআই দিয়ে তৈরি সংবাদ পড়ার বিষয়ে বেশ অস্বস্তিবোধ করেন, বিশেষ করে রাজনীতির মতো বিষয়গুলোতে।
এ কারণেই সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এআই-নির্ভর তথ্য ব্যবহারের সময় মূল উৎস যাচাই করা, একাধিক বিশ্বাসযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখা এবং প্রামাণ্য সংবাদমাধ্যম বা গবেষণার ওপর নির্ভর করা জরুরি। অন্যথায় ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।