বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট © টিডিসি ফটো
খামারভিত্তিক মাছচাষে রোগ সংক্রমণ দীর্ঘদিন ধরে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পাঙাস মাছের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে প্রতিবছর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারিরা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঙাস মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর গবেষকরা।
গবেষণার প্রাথমিক ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণা সফল হলে পাঙাস চাষে রোগজনিত ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং মৎস্য উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
সম্প্রতি ময়মনসিংহে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রম পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
রোগে বড় ক্ষতির মুখে খামারিরা
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে—বিশেষ করে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায়—পাঙাসসহ বিভিন্ন চাষযোগ্য মাছের মধ্যে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ দেখা যায়। ঘন চাষব্যবস্থা, পানির মানের অবনতি এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে এসব রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, পাঙাস মাছের ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ বর্তমানে উৎপাদনের অন্যতম বড় বাধা। অনেক সময় খামারে হঠাৎ করেই ব্যাপক হারে মাছ মারা যায়, যাকে স্থানীয়ভাবে “মড়ক” বলা হয়। এতে একটি খামারের পুরো উৎপাদনই ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রোগ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে বিএফআরআই। গবেষকরা রোগাক্রান্ত মাছের কিডনি, লিভার, ব্রেইন ও প্লীহা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল কালচার মিডিয়ায় পরীক্ষা করেন। পরে মলিকুলার বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগজীবাণুর সুনির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ করা হয়।
পাঙাসের জন্য তৈরি হচ্ছে ভ্যাকসিন
বর্তমানে বিএফআরআই “মিঠাপানির মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন” শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় পাঙাস মাছের জন্য একটি নিষ্ক্রিয় (ইনঅ্যাক্টিভেটেড) ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে।
গবেষণায় রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া পৃথক করার পর সেগুলো ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পরে ব্যাকটেরিয়াল কোষ পুনঃসাসপেন্ড ও সেন্ট্রিফিউজ করার মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় কোষ প্রস্তুত করা হয়। এই কোষগুলো অ্যাডজুভ্যান্ট ও ন্যানোপার্টিকেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিশেষ ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে এই ভ্যাকসিন ব্রুড পাঙাস মাছের শরীরে ইনট্রাপেরিটোনিয়াল (আইপি) পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হয়। এতে ইমিউনাইজড ব্রুড মাছ থেকে উৎপাদিত পোনাগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়।
মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল
ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যাচাই করতে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার পাঁচটি খামারে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত পোনা চাষ করা হয়। পরে এসব মাছের খাদ্যের সঙ্গে ওরাল ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত পাঙাস পোনার বেঁচে থাকার হার প্রায় ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে ভ্যাকসিন না দেওয়া পোনার ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, এসব ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে উন্নত ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা পাঙাস মাছের রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গবেষণা
বাজেট ও জনবল সংকটের মধ্যেও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিএফআরআই। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় গবেষণা সরঞ্জাম, আধুনিক ল্যাব সুবিধা ও দক্ষ জনবল নিয়োগে সমস্যা দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএফআরআই-এর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সিরাজুম মনির বলেন, “উন্মুক্ত জলাশয় থেকে বিলুপ্তপ্রায় হয়ে পড়া অনেক মাছের জাত সংরক্ষণ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। ইতোমধ্যে ঢেলা, শোল, বাইম, রানি, কাজলি, বাতাসি, কাকিলা, কাওন ও ভোল মাছ নিয়ে গবেষণা চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “মাছের বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করে আমরা ভ্যাকসিন ডেভেলপ করছি। চূড়ান্ত ট্রায়াল সম্পন্ন হলে এটি বাজারজাত করা সম্ভব হবে। এতে নিরাপদ মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়বে।”
গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
মৎস্যখাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো হলে দেশের অর্থনীতিতে এর বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাঙাস মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন সফল হলে তা খামারিদের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি সম্ভাবনাও বাড়াবে।
সব মিলিয়ে, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চলমান এই গবেষণা কার্যক্রম দেখাচ্ছে—সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।