নতুন স্মার্টফোন © এআই সম্পাদিত ছবি
নতুন স্মার্টফোন কেনার পর অনেকেই দ্রুত সেটআপ করে ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু ফোনের সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিন ভালো পারফরম্যান্স ধরে রাখতে প্রথম দিনেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ফোন ব্যবহারের শুরুতেই কয়েকটি সেটিংস ঠিক করে নিলে ভবিষ্যতে নানা সমস্যা এড়ানো যায়।
পুরোনো ফোনের তথ্য নিরাপদে স্থানান্তর করুন
নতুন ফোন হাতে পাওয়ার পর প্রথম কাজ হওয়া উচিত পুরোনো ফোনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্থানান্তর করা। ছবি, ভিডিও, পরিচিতি নম্বর, নথি, অ্যাপের তথ্য ও প্রয়োজনীয় ফাইল নতুন ডিভাইসে নেওয়ার আগে পুরোনো ফোনের ব্যাকআপ রাখা জরুরি।
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে গুগল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এবং আইফোনে আইক্লাউড বা ডিভাইস ট্রান্সফার সুবিধার মাধ্যমে সহজেই তথ্য স্থানান্তর করা যায়। তবে তথ্য স্থানান্তরের আগে পুরোনো ফোনে থাকা অপ্রয়োজনীয় ফাইল, ডুপ্লিকেট ছবি ও ব্যবহার না করা অ্যাপ মুছে ফেললে নতুন ফোনে বাড়তি জায়গা পাওয়া যায়।
অপারেটিং সিস্টেম ও নিরাপত্তা আপডেট দিন
নতুন ফোন কেনার পর অনেক সময় সেটিতে পুরোনো সফটওয়্যার সংস্করণ থাকতে পারে। তাই প্রথমেই ফোনের অপারেটিং সিস্টেম আপডেট করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিয়মিতভাবে পরামর্শ দেয়, নতুন ডিভাইস ব্যবহারের শুরুতেই নিরাপত্তা আপডেট ইনস্টল করা উচিত। কারণ এসব আপডেটে নিরাপত্তা দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি ফোনের কর্মক্ষমতা ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাও উন্নত করা হয়। অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সফটওয়্যার আপডেট এবং আইফোনে ‘সফটওয়্যার আপডেট’ অপশনে গিয়ে নতুন আপডেট পরীক্ষা করা যায়।
আরও পড়ুন : ২৪ জুলাই: ইন্টারনেট ফিরতেই প্রকাশ পায় সহিংসতার চিত্র, শুরু হয় গণগ্রেপ্তার
শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও বায়োমেট্রিক চালু করুন
নতুন ফোনে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ব্যাংকিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থাকে। তাই শুরুতেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সহজ পিন বা জন্মতারিখের মতো তথ্য ব্যবহার না করে শক্তিশালী পাসকোড ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
পাশাপাশি আঙুলের ছাপ, ফেস আনলক বা অন্যান্য বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা সুবিধা চালু করা যেতে পারে। তবে শুধু ফেস আনলকের ওপর নির্ভর না করে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা নিরাপদ বলে মনে করেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ মুছে ফেলুন
অনেক নতুন ফোনে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল অপারেটরের দেওয়া কিছু পূর্বনির্ধারিত অ্যাপ থাকে, যেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহার করা হয় না।এসব অ্যাপ ফোনের স্টোরেজ দখল করে, ব্যাটারির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং কখনো কখনো অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তাই প্রয়োজন নেই এমন অ্যাপ আনইনস্টল বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া ভালো।
অ্যাপ ডাউনলোডে সতর্ক থাকুন
নতুন ফোন পাওয়ার পর অনেকেই একসঙ্গে অনেক অ্যাপ ইনস্টল করেন। তবে অজানা ওয়েবসাইট বা অননুমোদিত উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা উচিত নয়।
অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের গুগল প্লে স্টোর এবং আইফোন ব্যবহারকারীদের অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অ্যাপ ইনস্টলের সময় কোন কোন অনুমতি চাওয়া হচ্ছে, সেটিও খেয়াল করা জরুরি। যেমন: কোনো সাধারণ ক্যালকুলেটর অ্যাপ যদি ক্যামেরা, মাইক্রোফোন বা যোগাযোগ তালিকার অনুমতি চায়, তাহলে সতর্ক হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন : ১২ প্রতিষ্ঠানে নতুন চেয়ারম্যান দিল সরকার
ব্যাটারি ব্যবহারের নিয়ম ঠিক করুন
নতুন ফোনের ব্যাটারি দীর্ঘদিন ভালো রাখতে শুরু থেকেই সঠিক অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক স্মার্টফোনের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার পর চার্জ দেওয়ার চেয়ে নিয়মিত চার্জে রাখা ভালো।
একটানা দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ফোন ব্যবহার করা বা চার্জে লাগানো অবস্থায় ভারী গেম খেলা ব্যাটারির ক্ষতি করতে পারে। অনেক ফোনে এখন ব্যাটারি অপটিমাইজেশন, অ্যাডাপটিভ চার্জিং বা চার্জিং লিমিট সুবিধা থাকে। এগুলো চালু করলে ব্যাটারির আয়ু বাড়তে পারে।
ডিসপ্লে ও নোটিফিকেশন সেটিংস ঠিক করুন
নতুন ফোনের ডিফল্ট সেটিংস অনেক সময় ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী থাকে না। ব্যাটারি সাশ্রয়ের জন্য স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা, অটো লক সময় এবং রিফ্রেশ রেট প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা যেতে পারে। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করলেও ব্যাটারি সাশ্রয় হয় এবং মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।
ক্লাউড ব্যাকআপ চালু করুন
ফোন হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেন হারিয়ে না যায়, এজন্য শুরু থেকেই ব্যাকআপ ব্যবস্থা চালু করা উচিত। গুগল ফটোস, গুগল ড্রাইভ, আইক্লাউডসহ বিভিন্ন ক্লাউড সেবার মাধ্যমে ছবি, ভিডিও ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ব্যক্তিগত ছবির জন্য একাধিক ব্যাকআপ রাখার পরামর্শ দেন।
ফোনের আইএমইআই নম্বর সংরক্ষণ করুন
নতুন ফোন কেনার পর এর আইএমইআই নম্বর লিখে রাখা জরুরি। ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে এই নম্বর শনাক্তকরণে কাজে লাগে। আইএমইআই নম্বর সাধারণত ফোনের বক্স, ক্রয়ের রসিদে ডায়াল করলে পাওয়া যায়।
চার্জার ও আনুষঙ্গিক পণ্য যাচাই করুন
নতুন ফোনের সঙ্গে দেওয়া চার্জার ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ। অন্য চার্জার ব্যবহার করলে সেটি যেন ফোনের নির্ধারিত ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নকল চার্জার বা নিম্নমানের কেবল ব্যবহার করলে ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ফোন পরিষ্কার ও সুরক্ষিত রাখুন
নতুন ফোনের সঙ্গে ভালো মানের কভার ও স্ক্রিন প্রটেক্টর ব্যবহার করলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত মোটা কভার ব্যবহার করলে ফোনের তাপ বের হওয়ার সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এমন কভার ব্যবহার করা উচিত যা সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
আরও পড়ুন : পুষ্টিকর খাবার কিনতে অক্ষম বিশ্বের ২৬৯ কোটি মানুষ
গোপনীয়তা সেটিংস পরীক্ষা করুন
নতুন ফোন ব্যবহারের আগে প্রাইভেসি সেটিংস পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। কোন অ্যাপ লোকেশন, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করতে পারবে তা নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষজ্ঞরা প্রয়োজন ছাড়া লোকেশন ট্র্যাকিং বন্ধ রাখা এবং নিয়মিত অ্যাপের অনুমতি পর্যালোচনা করার পরামর্শ দেন।
পুরোনো ফোন বিক্রির আগে তথ্য মুছে ফেলুন
নতুন ফোন নেওয়ার পর পুরোনো ফোন বিক্রি করলে শুধু ছবি বা অ্যাপ মুছে দিলেই যথেষ্ট নয়। প্রথমে সব অ্যাকাউন্ট থেকে লগআউট করতে হবে, তারপর সম্পূর্ণ ফ্যাক্টরি রিসেট করতে হবে। অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন দুই ক্ষেত্রেই ইরেজ অল ডাটা বা ফ্যাক্টরি রিসেট অপশন ব্যবহার করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য পুরোনো ফোন বিক্রির আগে এই ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন স্মার্টফোন শুধু একটি প্রযুক্তিপণ্য নয়, এটি ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই কেনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার সঠিক সেটআপই ফোনের নিরাপত্তা, গতি ও দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখে।