প্রতিকূলতা পেরিয়ে প্রযুক্তি গবেষণায় পলিটেকনিক শিক্ষার্থী নাহিদ আলম

১২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৮ PM
মো. নাহিদ আলম

মো. নাহিদ আলম © সংগৃহীত

প্রতিকূলতা, পারিবারিক মতপার্থক্য, আর্থিক সংকট ও একাধিক ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে প্রযুক্তি গবেষণায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন রাজশাহীর তরুণ প্রযুক্তি গবেষক মো. নাহিদ আলম। শূন্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করে বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন তিনি।

সপরিবারে রাজশাহীতে বসবাসকারী নাহিদ আলমের প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহের শুরু স্কুলজীবনেই। ২০১২ সালে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় জায়গা করে নেন তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই অ্যান্ড্রয়েড কাস্টম রম, সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি নিয়ে শুরু করেন নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তবে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের স্বপ্ন ছিল অন্যরকম। মা চেয়েছিলেন নাহিদ চিকিৎসক হবেন, আর বাবার প্রত্যাশা ছিল সরকারি চাকরিতে যোগ দেবেন।

২০১৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার পর পুলিশ বাহিনীতে চাকরির সুযোগ এলেও সেটি গ্রহণ করেননি তিনি। পরিবারের ইচ্ছার বিপরীতে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রযুক্তি শিক্ষাকেই বেছে নেন। ভর্তি হন রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। সেখানে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে পড়াশোনা শেষ করে সর্বমোট সিজিপিএ ৩.৭১ অর্জন করেন। সংকটের মধ্যেই নতুন পথের সন্ধান শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি প্রযুক্তিতে নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন নাহিদ।

করোনাকালে ব্যবহারকারী ইন্টারফেস ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা নকশা (UI/UX) নিয়ে কাজ শেখার পাশাপাশি মুক্তপেশায় যুক্ত হন। ধীরে ধীরে প্রযুক্তি খাতে নিজের দক্ষতার পরিচয় তৈরি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে গুগলের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিকভাবে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এটি তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও দীর্ঘমেয়াদি চাকরিকে নিজের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি তিনি।

২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর গুগলের চুক্তিভিত্তিক কাজ থেকে সরে এসে গবেষণা ও নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্যোগে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। উচ্চশিক্ষার পথেও বাধা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন নাহিদ। কিন্তু ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে রাজশাহীতে ফিরে আসতে হয় তাঁকে। পরে নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল। ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণার কাজ চালিয়ে যান তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি বিজ্ঞান উৎসবে প্রকল্প নিয়ে অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন।

তাঁর কাছে এই অর্জন শুধু একটি পুরস্কার ছিল না; বরং নানা বাধা পেরিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার একটি সুযোগও ছিল। বিশ্বরেকর্ডের স্বপ্ন, কিন্তু ব্যর্থতার ধাক্কা নাহিদের পথ সবসময় সাফল্যে ভরা ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময় ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও ‘ড্রি বিজ’ নিয়ে বিশ্বরেকর্ডের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এ উদ্যোগকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট ধারণার সত্ত্ব নিয়ে জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

একটি ব্যর্থতা যেখানে অনেককে থামিয়ে দিতে পারে, নাহিদের ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে ওঠে নতুন করে শুরু করার কারণ। ব্যর্থতার পর তিনি নিজেকে গুটিয়ে না নিয়ে প্রযুক্তি ও গবেষণার নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে থাকেন।

নতুন কর্মক্ষেত্র ও ‘লেক্সগ্লোবাল বিডি’ পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কোর৪২-এ দূরবর্তীভাবে কাজ করার সুযোগ পান নাহিদ আলম। একই সময়ে আইন ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে ‘লেক্সগ্লোবাল বিডি’ নামে একটি উদ্যোগ গড়ে তোলেন তিনি। জানা যায়, প্রকল্পটির প্রাথমিক ধারণা তৈরিতে তাঁর সাবেক জীবনসঙ্গী ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেরাবীন রিয়ার একটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। প্রযুক্তির সঙ্গে আইনকে যুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন ধরনের সেবা ও প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম
নাহিদ আলমের সাফল্যের গল্পকে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার গল্প বললে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে নিজের পছন্দের পথ বেছে নেওয়ার সাহস, পরিবারের প্রত্যাশার সঙ্গে মতপার্থক্য, আর্থিক সংকট, ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়, কর্মজীবনের পরিবর্তন এবং ব্যর্থতার পর আবার শুরু করার মানসিক শক্তি। যে তরুণকে একসময় পরিবার চিকিৎসক কিংবা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, সেই তরুণ শেষ পর্যন্ত নিজের স্বপ্নের পথেই হাঁটেন। চাকরির সুযোগ পেয়েও নিজের আগ্রহের বাইরে না গিয়ে প্রযুক্তিকে বেছে নেন।

উচ্চশিক্ষার পথে বাধা এসেছে, বিশ্বরেকর্ডের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে কঠিন সময়—তবুও থেমে থাকেননি তিনি। নাহিদের ভাষায়, সাফল্য কোনো একটি দিনের অর্জন নয়। বরং সফলতা অসংখ্য ব্যর্থতা, অপেক্ষা, পরিশ্রম ও আবার শুরু করার সমষ্টি। তাঁর পথচলা দেখিয়েছে, কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সবসময় সরল পথ পাওয়া যায় না। কখনো কখনো ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়।

বর্তমানে ‘লেক্সগ্লোবাল বিডি’সহ বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্যোগ, গবেষণা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট কাজ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নাহিদ আলম। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রযুক্তি ও গবেষণাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে। শূন্য থেকে শুরু করে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করা নাহিদ আলমের গল্প তাই কেবল একজন প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বারবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প—যেখানে ব্যর্থতা শেষ নয়, বরং নতুন শুরুর একটি অধ্যায়।

টুঙ্গিপাড়ায় চোরাই মোটরসাইকেলসহ চোর চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
বেতন বন্ধ হতে পারে ৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
করপোরেট সেলস বিভাগে নিয়োগ দেবে রূপায়ণ গ্রুপ, আবেদন ১১ সেপ্ট…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
নওগাঁর ১৯ প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করতে পারেনি কোন পরীক্ষার্থী 
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কোনো আপোস নয়: নুরুন্নিসা স…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অবদান নেই: রিজভী
  • ১২ আগস্ট ২০২৬