ডাক্তার হবার ব্যর্থতা থেকে বিচারকের স্বপ্ন, বিজেএসের প্রথম ভাইভাতেই সফল আয়েশা

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০০ AM , আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ AM
জান্নাতুল আয়েশা

জান্নাতুল আয়েশা © টিডিসি সম্পাদিত

মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়ার পর দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন জান্নাতুল আয়েশা। সেই সময় এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। তখন হয়ত জানতেন না, এই সিদ্ধান্তই একদিন তাকে নিয়ে যাবে বিচারকের আসনে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, মা-বাবার অনুপ্রেরণা, শিক্ষকদের দোয়া ও নিজের ওপর বিশ্বাসকে সঙ্গী করে অবশেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সফল হয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী।

দুইশ জনের তালিকায় নিজের রোল নম্বর খুঁজে পাওয়ার মুহূর্তটি এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয় জান্নাতুলের কাছে। যে স্বপ্নের জন্য দিনের পর দিন একটি ঘরের কোণে বসে কেঁদেছেন, পড়েছেন, নিজেকে প্রস্তুত করেছেন সেই স্বপ্নই এখন বাস্তব।

শুধু পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়া নয়, জান্নাতুলের এই পথচলায় রয়েছে শৈশবের কঠোর অনুশাসন, মেডিকেলে সুযোগ না পাওয়ার পর নতুন পথে যাত্রা, বেয়ার অ্যাক্টভিত্তিক প্রস্তুতি, প্রথম ভাইভাতেই সফলতা এবং নিজের প্রতি অবিচল আস্থার গল্প।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে নানাবাড়িতে জন্ম জান্নাতুল আয়েশার। তবে পিতামাতার কর্মস্থলের সুবাদে তার স্কুল ও কলেজজীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। পড়াশোনায় হাতেখড়ি বাবার হাত ধরে। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি হাতের লেখার প্রতিও ছিল বাবার বিশেষ নজর।

জান্নাতুল বলেন, ‘আমার জন্ম বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে, নানাবাড়িতে। পিতামাতার কর্মস্থলের সুবাদে স্কুল এবং কলেজ জীবন পার করেছি চট্টগ্রামে। পড়াশোনা হাতেখড়ি বাবার হাত ধরে। বাবা ছোটবেলায় প্রচুর লিখাতেন। হাতের লেখা যেন সুন্দর, স্বচ্ছ এবং নির্ভুল হয়, তার জন্য বাবার কড়া শাসন ছিল ছোটবেলায়। যা পরবর্তী জীবনে আমার উপকারে এসেছে।’

২০১৭ সালে মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়ার পর কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন জান্নাতুল। ভেবেছিলেন, আবার প্রস্তুতি নেবেন। সেই সময় একজন বড়ভাই তাকে আইন বিভাগে পড়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তার মা-বাবাকে আইন পড়ার পর সম্ভাব্য ক্যারিয়ার সম্পর্কেও জানান। এরপরই আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

আরও পড়ুন: ১৭তমে স্বামী, ১৮তমে স্ত্রী—বিজেএসে দুজনই তৃতীয়

জান্নাতুল বলেন, ‘মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উত্তম পরিকল্পনাকারী। আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পিছনে একটি গল্প আছে। ২০১৭ সালে মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না হওয়ার পর ভেবেছিলাম সেকেন্ড টাইম প্রিপারেশন নিব, তখন আমার একজন দুলাভাই তিনি আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং আমার মা-বাবাকে আইন বিভাগে পড়াশোনার ফলে সম্ভাব্য ক্যারিয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। পরবর্তীতে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে যাই।’

আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর ধীরে ধীরে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু হয় দীর্ঘ প্রস্তুতি।

জান্নাতুলের কাছে তার সাফল্যের সবচেয়ে বড় অবদান মা-বাবার। পড়াশোনার পুরো সময়টাতে তারা পাশে থেকেছেন। প্রয়োজনের সময় পড়ার টেবিলে খাবার ও পানিও এগিয়ে দিয়েছেন। প্রতিটি কঠিন সময়ে দিয়েছেন মানসিক শক্তি।

জান্নাতুল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় অবদান আল্লাহ তায়ালার পরেই আমার মা-বাবার। পড়ার টেবিলে খাবার পানিটুক পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। দিনরাত মাথার উপর বটবৃক্ষের ন্যায় ছায়া দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা আমার স্বপ্নকে লালন করে, আমাকে সাহায্য করেছিলেন। আমার স্কুল-কলেজ এবং সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকগণের দোয়া এবং তাদের শিক্ষা আমাকে আলোকিত করেছে। ভার্সিটি জীবনে খুব সুন্দর একটি বন্ধুমহল পেয়েছি। বিশেষ করে হালিমাতুস সাদিয়া (১৭ বিজেএস, মেধাক্রম ১ম) এবং তার পরিবারের সদস্য আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।’

নির্দিষ্ট করে প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়তে হবে এমন কোনো সময়সীমা নিজের জন্য বেঁধে দেননি তিনি। বরং প্রতিদিনের লক্ষ্য পূরণ করাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। জান্নাতুল বলেন, ‘বেয়ার অ্যাক্টভিত্তিক প্রিপারেশন নিয়েছি। তবে যখন যার কাছে যে বইয়ের নাম শুনেছি, কিনে ফেলার চেষ্টা করেছি। যে অংশটুকু প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, বেয়ার অ্যাক্টে যুক্ত করে নিয়েছি। পুরো জুডিশিয়ারি সিলেবাসকে ভাগ করে ৩০-৪০ দিনে শেষ করার চেষ্টা করতাম। প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি টার্গেট থাকত, ততটুকু শেষ করতে, যত ঘণ্টা প্রয়োজন হতো, পড়তাম।’

২০১৭ সালে মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না হওয়ার পর ভেবেছিলাম সেকেন্ড টাইম প্রিপারেশন নিব, তখন আমার একজন দুলাভাই তিনি আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন

১৮তম বিজেএসই ছিল জান্নাতুলের প্রথম জুডিশিয়ারি ভাইভা। প্রথমবারেই সফল হয়ে এখন সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।  তিনি বলেন, ১৮তম জুডিশিয়ারি আমার ১ম ভাইভা ছিল এবং আলহামদুলিল্লাহ এবারই সফল হয়েছি।

জান্নাতুল বলেন, ‘ভাইবার প্রথম এবং প্রধান সূত্র হচ্ছে নমনীয়তা, ভদ্রতা, আদব এবং ভাব-ভঙ্গি। ১৮তম জুডিশিয়ারির ভাইভা প্রিপারেশনের শুরুতেই আমি শিখে নিয়েছি, কিভাবে বিনয়ের সাথে সরি বলতে হয়। এর পাশাপাশি বেয়ার অ্যাক্ট ও লিখিত পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রিভিশন দিয়েছি। বিভিন্ন ভাইভা অভিজ্ঞতা পড়েছি এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে কীভাবে উত্তর দেব, তা নিজের মধ্যে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণদের জন্য জান্নাতুলের বলেন, আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না। ব্যর্থতা এলেও লক্ষ্য থেকে সরে না গিয়ে প্রয়োজন হলে প্রস্তুতির পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে।

তিনি বলেন, Please, never lose hope & self confidence. নিজেকে বারবার বলুন, ‘আমি পারব, আমাকে দিয়েই হবে’। এবং নিরলস চেষ্টা করে যান। যদি সফলতা না আসে, তবে change the route, not the goal. আমি এই কথাগুলো ধারণ করেই এতটুকু আসতে পেরেছি।

সহকারী জজ হিসেবে ভবিষ্যতে দেশের বিচারব্যবস্থায় নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চান জান্নাতুল। তার কাছে বিচারকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মানুষ তার নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেই, আমি মনে করি দেশের জন্য যথেষ্ট। সেক্ষেত্রে বিচারক হিসেবে, আইনানুযায়ী ন্যায় বিচার প্রদান করাই আমার মুখ্য দায়িত্ব। বিচারপ্রার্থী মানুষদের জন্য আমি এতটুকুই নিষ্ঠার সাথে করতে চাই, যেন তারা ন্যায়বিচার এবং দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল হন।’

স্ত্রীকে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়েছিলেন সাবেক স্বামী, ৭ দিন প…
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আটকে রেখে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচারের চেষ্টা, উদ্ধার ১৭
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতে স্কলারশিপের সুযোগ দেবে অস্ট্রেলিয়ার…
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রেমের টানে বাংলাদেশে চীনা যুবক, অতঃপর বিয়ে
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়ায় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতে স্কলারশিপের সুযোগ, আ…
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডাক্তার হবার ব্যর্থতা থেকে বিচারকের স্বপ্ন, বিজেএসের প্রথম …
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬