মো. সাইফুল ইসলাম সুমন © ফাইল ছবি
একবার নয়, দুইবার নয়—চারবার ব্যর্থতার তিক্ত স্বাদ পেয়েছেন। কখনও প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বাদ পড়েছেন, কখনও ভাইভা পর্যন্ত গিয়েও ফিরতে হয়েছে খালি হাতে, আবার কখনও লিখিত পরীক্ষার বাধা পেরোতে পারেননি। তবুও স্বপ্ন থেকে একচুলও সরে যাননি ভোলার চরফ্যাশনের মো. সাইফুল ইসলাম সুমন। দীর্ঘ অপেক্ষা, নিরন্তর পরিশ্রম আর অদম্য আত্মবিশ্বাসের পুরস্কার হিসেবে অবশেষে ৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
সুমনের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের উত্তর আইচা গ্রামের তালুকদার বাড়িতে। বাবা মো. শাহে আলম তালুকদার ও মা মোছা. রোকেয়া বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি মেজো। গ্রামের সাধারণ পরিবেশেই বেড়ে ওঠা সুমনের শৈশব কেটেছে খেলাধুলা আর পড়াশোনার সমন্বয়ে।
পড়ালেখার হাতেখড়ি শুরু হয় রসুপুর কো-ইড প্রাইমারি থেকে। শিক্ষাজীবনের শুরু চরফ্যাশনেই। ২০১০ সালে চর আইচা হাই স্কুল থেকে এসএসসি (৪.৬৯) এবং ২০১২ সালে রসুলপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি (৪.৯০) নিয়ে পাস করেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।
বিসিএস জার্নি বিষয়ে সাইফুল ইসলাম সুমন বলেন,বিসিএসের স্বপ্ন নিয়ে আমার পথচলা শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে। প্রথম পরীক্ষা ছিল ৪১তম বিসিএস। কিন্তু শুরুটা ছিল হতাশার—প্রিলিমিনারিতেই বাদ পড়ি। এরপর ৪৩তম ও ৪৪তম বিসিএসে ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছেও কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার পায়নি।এরপর ৪৬তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায়ও ব্যর্থ হন। অনেকেই হয়তো এতবার ব্যর্থ হওয়ার পর স্বপ্ন বদলে ফেলতেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, একদিন না একদিন সফলতা আসবেই। সেই বিশ্বাসই আজ আমাকে পৌঁছে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
প্রস্তুতি সম্পর্কে সুমন বলেন, ‘প্রস্তুতির গল্পটাও ছিল সংগ্রামের। দিনে কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়া, রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা, প্রতিদিন অনলাইন এমসিকিউ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া—এভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিনি। লিখিত পরীক্ষার জন্য কয়েকজন বন্ধু ও সিনিয়রদের নিয়ে স্টাডি গ্রুপ তৈরি করে নিয়মিত পরীক্ষা দিতাম এবং একে অপরের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতাম। সুমনের মতে, এই অনুশীলনই প্রস্তুতিকে আরও শাণিত করেছে।
বর্তমানে সুমন ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি চাকরির ব্যস্ততার মাঝেও বিসিএসের স্বপ্নকে বিসর্জন দেননি। অফিস শেষে বই, নোট আর মডেল টেস্টই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।
ক্যাডার চয়েজ ক্ষেত্রে সুমন বলেন,ক্যাডার চয়েজ দেবার বেলায় একটু কৌশলী হওয়া উচিত। কারন আমি যে জবটা ওন করি সেই অনুযায়ী ই চয়েস হওয়া উচিত। অযথা চয়েজ দিয়ে পদ নষ্ট করার কোনো মানে নেই।
তিনি বলেন,আমি ছোটবেলা থেকেই পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম এবং সমাজে ঘটে যাওয়া অন্যায় দেখে মনে হতো, যদি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতাম! সেই শৈশবের স্বপ্নই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে সুমন বলেন, তিনি এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চান, যেন মানুষের কল্যাণে করা কাজের জন্য সবাই তাকে মনে রাখে। তিনি বলেন,আমি কোনো স্থান ছেড়ে আসলেও মানুষ যেন আমার সৎ কাজের জন্য আমাকে মনে রাখে। এমন কোনো কাজ না করা যেটা আমি এবং আমার পরিবারকে খাটো করে। এছাড়াও সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চান তিনি।
তিনি বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে বলেন,একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে যদি পারিবারিক পিছুটান না থাকে তাহলে একমাত্র বিসিএসকে ফোকাস করে পড়লে দ্রুতই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব তবে যদি পারিবারিক আর্থিক অস্বচ্ছলতা থাকে তবে বিকল্প চিন্তাও মাথায় রাখা উচিত। যেমন আমি বিসিএসের পাশাপাশি কৃষি ব্যাংকে সুপারিশপ্রাপ্ত ও জনতা ব্যাংকে ছয় মাসের মত জব করি। পরবর্তীতে বর্তমানে বোরহানউদ্দিন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
তিনি আরও বলেন, ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়। প্রতিটি ব্যর্থতা নতুন করে শেখার সুযোগ তৈরি করে। ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে একদিন সফলতা ধরা দিতেই পারে।
সুমন আরও বলেন,আমার গ্রাম বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষা যেখানে মানুষজনের ভিতর বিসিএস ক্যাডার নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারনা নেই। আমার স্বপ্ন ছিলো ক্যাডার হয়ে নিজ এলাকার তরুনদের আইডল হবার যাতে পরবর্তীতে আরো তরুনরা পড়ালেখায় আগ্রহী হয় এবং আমার এলাকার চেহারা পাল্টে যায়।
সুমনের এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী, স্বজন এবং চরফ্যাশনের মানুষের মধ্যে আনন্দের আমেজ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, তিনি সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ পুলিশের একজন আদর্শ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং ভোলার জন্য বয়ে আনবেন নতুন গৌরব।