প্রাথমিক শিক্ষকের গুরুত্ব অনুধাবন করে মর্যাদা বাড়ানো হোক

৩০ এপ্রিল ২০১৯, ১১:০২ AM

কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোনো ক্লাসে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কে কে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান? এটি নিশ্চিত, ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে চার-পাঁচজনের বেশি এ পেশায় আগ্রহের কথা বলবেন না! যদি নির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হয়, কে কে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান? তাহলে একজনও আগ্রহ দেখাবেন কি না সন্দেহ আছে!

বাস্তবতা হলো- প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি এখনো মেধাবী চাকরিপ্রত্যাশীদের ন্যূনতম আগ্রহের জায়গায় পৌঁছেনি। উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যেভাবে সম্মানের চোখে দেখা আর মানমর্যাদা দেয়া হয়, আমাদের দেশে তার কিঞ্চিতও দেয়া হয় না! প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা দিনের পর দিন অবহেলিত হয়ে আসছেন। এ পেশায় বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা এখনো কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। পুরো চাকরিকালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বাভাবিকভাবে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। আবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান বেতন গ্রেডের পার্থক্য তিন ধাপ। এই বেতনবৈষম্য প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে সব সময় এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করছে।

শিক্ষাজীবনের ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। এ ভিত্তি যদি মজবুত না হয়, তাহলে শিশুর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি শিক্ষাজীবনও থেমে যেতে পারে! মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দরকার মানসম্মত ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক। নির্দিষ্ট ক্লাসের প্রতিটি পাঠদানে শিখনফল অর্জনের কাজটি সহকারী শিক্ষকদেরই অতি গুরুত্বের সাথে করতে হয়। তাই দ্রুত প্রধান শিক্ষকের সাথে সহকারী শিক্ষকের বেতন গ্রেডের তিন ধাপের পার্থক্যের অবসান হওয়া জরুরি। প্রধান শিক্ষকদের বর্তমান বেতন গ্রেড ১১তম (দ্বিতীয় শ্রেণীর)। ২০১৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকেরা এ গ্রেডে বেতন পেয়ে আসছেন। সহকারী শিক্ষকেরা বেতন পান ১৪তম গ্রেডে। অনেক আগে থেকে তো বটেই, ২০১৪ সাল থেকে আরো জোরালোভাবে সহকারী শিক্ষকেরা বেতনবৈষম্য নিরসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। এ ছাড়া বেতনবৈষম্য নিরসনের দাবিতে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে লক্ষাধিক সহকারী শিক্ষক ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আমরণ অনশনে বসেন। তখন সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রী ও সচিবপর্যায় থেকে বেতনবৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিলে শিক্ষকেরা আশ্বস্ত হন। কিন্তু তার সুফল এখনো সহকারী শিক্ষকেরা পাননি।

আশার কথা হলো- সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেডের পার্থক্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বেতনবৈষম্য নিরসনকল্পে বিধিমালা সংশোধন করে সহকারী শিক্ষকের ১২তম গ্রেড আর প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে বেতন দেয়ার নির্দেশনা গেজেট আকারে জারির কাজ চলছে বলে জানা গেছে। তবে সহকারী শিক্ষকদের দাবি, প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে তাদের বেতন দেয়া হোক।

শিক্ষা ও শিক্ষকের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭৩ সালে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে কোনো বেতনবৈষম্য ছিল না। তখন প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের বেতন একই ছিল (শুধু প্রধান শিক্ষকেরা মাসিক ১০ টাকা হারে কার্যভার ভাতা পেতেন)। এখন প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক হিসেবে মেধাবীরা আসতে শুরু করেছেন। মেধাবীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় টানতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে বেতনবৈষম্য রাখা উচিত নয়।

প্রায় দুই কোটির বেশি শিশু শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের স্বপ্নের জায়গা হলো এ দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এ পেশায় দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের নিয়োগ দিতে হবে। এ জন্য শিক্ষক নিয়োগের বিধিমালাও সংশোধন করা জরুরি। কলেজ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় একই যোগ্যতা ও মাপকাঠি অনুসরণ করে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার পরিকল্পনা করা এখন সময়ের দাবি। এভাবে একইসাথে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে তাদের ইচ্ছানুসারে প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা কলেজগুলোতে শিক্ষক নিযুক্ত করা যেতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষকদের যোগ্যতাভিত্তিক স্কেল দেয়ার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে। শিক্ষকেরা তাদের যোগ্যতা তথা ডিগ্রি অনুসারে বেতন পাবেন। ডিগ্রি উচ্চতর হলে বেতনও বেশি হবে। সবচেয়ে দুঃখের কথা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এ দেশের তৃতীয় শ্রেণীর চাকরিজীবী! শিক্ষকেরা কেন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হবেন? অথচ সরকার সেবা চায় প্রথম শ্রেণীর! তিলে তিলে যারা নিজের সন্তানের মতো ছোট ছোট শিশুদের মানুষ গড়ার মহৎ কাজটি করেন, তারা দিন শেষে যদি প্রাপ্য মর্যাদা না পান তাহলে আর দুঃখের অন্ত থাকে না।

শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের কথাও বিবেচনা করতে হবে। কেননা, অন্য সব কাজ থেকে শিক্ষকতা সম্পূর্ণ ভিন্নতর পেশা। সর্বশেষ পে-স্কেলের সুপারিশেও শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেলের কথা ছিল। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে এ পেশায় সব ধরনের বৈষম্য দূর করে মানমর্যাদা বাড়তে হবে। মেধাবীরা যাতে অনায়াসে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। এতে প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি হবে মজবুত ও যুগোপযোগী। আর একেকটি বিদ্যালয় হয়ে উঠবে স্বপ্ন তৈরির কারখানা।

sadonsarker2005@gmail.com

মা-বাবার ভালোবাসা পেতে ‘কবিরাজকে’ ৬৬ লাখ টাকা দিল স্কুলছাত্…
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে এক মাসে প্রাণ গেল ২০৬ শিশুর
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে ত্রুটি, পাশ করলেও শত শত পরীক্ষার্থীকে…
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
জনবল নিয়োগ দেবে ব্রিটিশ-আমেরিকান রিসোর্স সেন্টার, কর্মস্থল …
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
স্কলারশিপে স্নাতকোত্তর-পিএইচডির সুযোগ তুরস্কে, মাসিক উপবৃত্…
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
ইরানের মতো লেবাননেও যুদ্ধবিরতি চায় তেহরান
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬