বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালযয়ের লোগো © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা ও আপগ্রেডেশন দেওয়ার প্রশাসনিক অনিয়ম উন্মোচিত হয়েছে। এই অনিয়মের তালিকায় রয়েছেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পিএ (ব্যক্তিগত সহকারী) মতিয়ার রহমান ।
ইউজিসির বিশেষ তদন্তে এই আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ার পর উপাচার্যের পিএ-সহ অবৈধ পদোন্নতি পাওয়া ১৫ কর্মকর্তার পেছনে খরচ হওয়া সমস্ত রাষ্ট্রীয় অর্থ ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি তাদের বাজেট বরাদ্দ বাতিলের কড়া সুপারিশ করেছে ইউজিসি গঠিত অ্যাসেসমেন্ট টিম।
নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বেরোবি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিশনের নির্দেশনা অমান্য করে এবং নিয়ম ভেঙে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের পদোন্নতি দিতে একটি নিজস্ব নীতিমালা তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সিন্ডিকেটের ১১৬তম সভার দোহাই দিয়ে ওই নীতিমালার অধীনে ২য় শ্রেণীর কর্মকর্তার পদমর্যাদা দেওয়া হয় ২৫ জনকে, যার ৩য় নামটিই ছিল উপাচার্যের পিএ মতিয়ার রহমান ও উপাচার্যের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মাহমুদ উল হাসান (পল্লব)।
অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। এরপর ১১১তম সিন্ডিকেটের সভার আলোকেই ওই ২৫ জনের মধ্য থেকে বেছে বেছে ১৫ জন কর্মচারীকে রাতারাতি ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে ‘আপগ্রেডেশন’ দিয়ে পদায়ন করা হয়।
ইউজিসির তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত মূল নীতিমালাটিই যেখানে সম্পূর্ণ অবৈধ, সেখানে তার ওপর ভিত্তি করে উপাচার্যের পিএ-সহ কর্মকর্তাদের এমন পদোন্নতি পুরোপুরি আইনবহির্ভূত এবং এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি সাধন হয়েছে।এই নজিরবিহীন অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যাচ্ছে ইউজিসি অ্যাসেসমেন্ট দল।
তারা জানিয়েছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে আপগ্রেডেশন পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য কোনো প্রকার বাজেট বরাদ্দ বা আর্থিক সুবিধা রাখা হবে না। একই সাথে, অবিলম্বে এই ১৫ জনের অবৈধ আপগ্রেডেশন বাতিল করে এখন পর্যন্ত বেতন-ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা বাবদ অপচয় হওয়া সমস্ত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলে আদায় করার জোর সুপারিশ জানানো হয়েছে। পুরো বিষয়টির সর্বশেষ অগ্রগতি কমিশনকে জরুরি ভিত্তিতে অবহিত করার জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ইউজিসির আপত্তিতে ফেঁসে যাওয়া বেরোবির ১৫ জন কর্মকর্তা হলেন- মো. মজিদুল হক (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মো. মাহবুবর রহমান প্রধান (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মো. মতিয়ার রহমান (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মো. জাহাঙ্গীর আলম (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মো. আসাদুল হক (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মো. নাহিদ পারভেজ (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মোছা. মুন্নুজান খাতুন (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মো. মাহাবুবুল আলম (সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা), ফাহিম মিয়া (সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা), মো. জাফরুল ইসলাম সরকার (সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা), মো. সাজেদুল করিম (সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা), মোছা. লুৎফা বেগম (ক্যাটালগার), মো. হাফিজুল ইসলাম (সেকশন অফিসার গ্রেড-২), মো. আরমান হোসেন (সেকশন অফিসার গ্রেড-২) এবং মো. মাহমুূদ উল-হাসান (সেকশন অফিসার গ্রেড-২)।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে সেখানে আমরা সবকিছু ব্যাখ্যা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কিছু আইন এবং ইউজিসির কিছু আইন পরস্পর সব ক্ষেত্রে মিল নেই। যার ফলে দেখা গেছে যে ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী এটা বৈধ ছিল না কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি বৈধ ছিল। যাদের আপগ্রেডেশন পদোন্নতি হয়েছে দেখা গেছে তাদের বেশিরভাগই ৮ বছর ১০ বছর ১২ বছর পর পদোন্নতি পেয়েছে।
বারবার নির্দেশ সত্ত্বেও নিয়ম বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিভিন্ন খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ও বরাদ্দ না পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, কিছু কিছু বাজেট কাটছাঁট করেছে কিন্তু সেগুলো পাবো না এমন না, ইউজিসির মাধ্যমে অন্য খাতে পাবো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী বলেন, এ বিষয়গুলো নিয়ে ইউজিসির সাথে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আর যে সকল কর্মচারীকে কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তাদের গ্রেড বাড়লেও বেতন আগের মতই থাকবে। সেটা তো আর ইউজিসি জানে না।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে এসেছে, এখানে কোনো অনিয়ম বা কোনো ধরণের নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে কি-না সেটা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।