কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি ফাইল ছবি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে বাধ্যতামূলক ছুটিতে যাওয়া তিন শিক্ষককে পুনরায় একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। একই সঙ্গে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী এম. আনিছুল ইসলামের ক্যাম্পাসে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১১তম সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
জানা যায়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী এম. আনিছুল ইসলামের ক্যাম্পাসে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে তিনি এখন থেকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। তবে, তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। একই সভায় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আলী রেজওয়ান তালুকদার এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক জসিম উদ্দিনকে পুনরায় স্বপদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের মার্চে কাজী এম. আনিছুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক নারী শিক্ষার্থীকে একাধিক পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। ই-মেইলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে পাঠানো অভিযোগের সঙ্গে কয়েকটি পিডিএফ এবং সেগুলোর মেটাডাটার তথ্যও দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের একটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত চলাকালে কাজী আনিছকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা এবং বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
এদিকে শনিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে কাজী আনিছের বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন একই বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী আসমা ইসলাম। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত। পোস্টে তিনি কাজী আনিছকে ‘শিক্ষক কম, মেয়েখোর বেশি’ বলে মন্তব্য করেন।
আসমার দাবি, বিভাগে ভালো ফলাফল করায় কাজী আনিছ তাঁর কাছ থেকে বিশেষ প্রত্যাশা করতেন। তা পূরণ না করায় বিভিন্ন সময়ে তিনি অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন। একদিন তাঁর চুলের ধরন নিয়ে ওই শিক্ষক বলেন, ‘এই যে চুলের গেটআপ তোমার, এ গেটআপে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখো?’ তাঁর আরও দাবি, থিসিস জমা দেওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে কাজী আনিছ তাঁর গবেষণার পুরো পদ্ধতি পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। তবে তিনি ওই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন না বলে জানান।
অন্যদিকে, ২০২০ সালে সান্ধ্য কোর্সের এক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়ন এবং বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে সহযোগী অধ্যাপক মো. রেজওয়ান তালুকদারের বিরুদ্ধে। পরে তাঁকে বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে যাওয়ার পরও তিন শিক্ষার্থীকে নম্বর প্রদান এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত ১০৩তম সিন্ডিকেট সভায় তাঁদেরকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
১১১তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফ ভূঁইয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘কাজী আনিস এবং ফিন্যান্সের জসিম ২ টাই পার্ভাট। কাজী আনিসকে একাডেমিক কার্যক্রমে সংযুক্ত এবং জসিমকে আগের পদে বহালের মধ্য দিয়ে ভিসি জানিয়ে দিলেন “স্টুডেন্ট ফার্স্ট” মানে কী।’ তিনি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান।
ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাহিম প্রশ্ন তোলেন, ‘যে শিক্ষকের কাছে ছাত্রীর ইজ্জত-সম্মান নিরাপদ নয়, প্রতিনিয়ত অনৈতিক কর্মকাণ্ডে অভিযুক্তদের পুনরায় স্বপদে বহাল ও ক্যাম্পাসে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করে—এই বুঝি “স্টুডেন্ট ফার্স্ট” নীতি?’
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসাইন আবির বলেন, ‘“স্টুডেন্ট ফার্স্ট” নীতি আসলে কী? যৌন নিপীড়কদের পদায়ন, একাডেমিক কাজে সংযুক্ত করে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করার সুযোগ করে দেওয়াটাই কি “স্টুডেন্ট ফার্স্ট” নীতি?’ তিনি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, ‘এটা সিন্ডিকেট সভায় নেওয়া একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। আমি এখন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি ভালোভাবে জেনে তখন বলতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেখলাম, তাঁদের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে বিচারকার্যও চলমান থাকবে। আমরা সবাই সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচার চাই।’