জবিতে ‘দৃশ্য ও শব্দে জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত © সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে গৃহীত ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের আয়োজনে ‘দৃশ্য ও শব্দে জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; এটি ছিল গণআকাঙ্ক্ষা, দৃশ্যমান প্রতিরোধ, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং প্রযুক্তিনির্ভর তারুণ্যের সাহসিকতার এক অনন্য অধ্যায়।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সাজিদ একাডেমিক ভবনের ৯১৫ নম্বর কক্ষে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিসতার জাহান কবির। প্রধান অতিথি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ও আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক ও লেখক এহসান মাহমুদ।
মূল প্রবন্ধে ড. খোরশেদ আলম বলেন, বাংলাদেশের অতীতের বিভিন্ন গণআন্দোলন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গণমাধ্যম জনগণের আকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে কাজ করেছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মূলধারার কিছু গণমাধ্যম আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পরিবর্তে একে 'জনদুর্ভোগ' বা 'জনভোগান্তি'র দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছে। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে 'ফ্রেমিং' একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
তিনি আরও বলেন, একটি শক্তিশালী দৃশ্য অনেক সময় হাজারো শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ন্যাপাম বোমায় দগ্ধ শিশুর ঐতিহাসিক আলোকচিত্র যেমন বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তেমনি জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদের বুলেটের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং দেশজুড়ে গণজাগরণ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রজন্মের ভূমিকাও তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম শুধু রাজপথেই নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ছিল। ইন্টারনেট শাটডাউন ও নানা বিধিনিষেধের মধ্যেও তরুণেরা ভিপিএন ও বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রাখে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আন্দোলনের বাস্তবতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ভবিষ্যতের সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আলোচক হিসেবে সাংবাদিক ও লেখক এহসান মাহমুদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে দিয়েছে। জুলাইয়ের চেতনা কখনো মুছে যাবে না। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে উপজীব্য করে নিজের রচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করেন, যা উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, জুলাই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়; বরং নতুন প্রজন্মের আত্মত্যাগ, সাহস এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলনের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিসতার জাহান কবির বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল বিজয়ের নয়, এটি অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ, আহত মানুষের কষ্ট এবং অসংখ্য পরিবারের বেদনার ইতিহাস। তিনি বলেন, একজন মা তার সন্তান হারানোর যে বেদনা বহন করেন, কিংবা আন্দোলনে আহত একজন নারী যে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করেন, তা কখনোই ভোলার নয়। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, জুলাইয়ের চেতনাকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, গবেষণা, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র ও অন্যান্য অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি জুলাইয়ের সাহসী তরুণদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাবিবা সুলতানা, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের শিক্ষক সামির আহমেদ, লাবিব নাজমুছ ছাকিব, রিয়াজ উদ্দিনসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা আলোচকদের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন দিক, গণমাধ্যমের ভূমিকা, নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব এবং ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতবিনিময় করেন। পরে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।