হাসনাত আব্দুল্লাহ © টিডিসি ফটো
সরকার ব্যাংক খাতে ঋণ খেলাপিদের জন্য আবারও সুযোগ তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ঋণ পুনঃফসিলের পর পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান এক বছরের শর্ত কমিয়ে ছয় মাস করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে ‘ঋণ খেলাপি ফ্রেন্ডলি এনভায়রনমেন্ট’ তৈরি করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রবিবার (৪ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘বাধা ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল। আমরা দেখছি এক্ষেত্রে ঋণ খেলাপীদের জন্য আবার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ঋণ খেলাপীরা এক বছর যদি পুনঃফসিল করার পরে এক বছর পার না হতো, সেক্ষেত্রে আর ডিরেক্টর হতে পারতেন না। আবার দেখতে পাচ্ছি, সেটিকে এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাসে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ঋণ খেলাপি ফ্রেন্ডলি একটা এনভায়রনমেন্ট ক্রিয়েট করা হচ্ছে।’
হাসনাত বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকের সংখ্যা ও ভূমিকা নিয়েও শিথিলতা আনার চেষ্টা চলছে। তার অভিযোগ, এর ফলে ব্যাংক খাত আবারও কয়েকটি পরিবার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে প্রত্যেকটা বোর্ড অব ডিরেক্টরসে আমাদের ৫০ শতাংশ হচ্ছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর করার সুযোগ ছিল, যাতে করে ব্যাংকগুলোতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে, এটা অ্যাসেসমেন্ট করার ক্ষেত্রে এককেন্দ্রিক না হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও একটা শিথিলতা আনার চেষ্টা সরকার চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মোটাদাগে সরকার ব্যাংকগুলোকে অলিগার্ক শ্রেণির হাতে, একই পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার আবার নতুন করে আয়োজন শুরু করেছেন।’
হাসনাত জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা প্রতিবাদ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে আপডেট জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টের সংশোধন নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার ভাষ্য, আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর বৈঠকে আইএমএফের চাপের কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেন হাসনাত। তবে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হাসনাত বলেন, ১৮(ক) ধারা বাতিলকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখলেও একই সঙ্গে দুটি ‘ব্যাকডোর’ খোলার চেষ্টা হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। এর মধ্যে ঋণ খেলাপি ঘোষণার সময়সীমা ৯০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৭০ দিন করার উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি ৯০ বিধির মধ্যে একটা নিয়ম ছিল যে ৯০ দিনের মধ্যে যারা ঋণ পরিশোধ করতে না পারবেন, ৯০ বিধিতে তাদেরকে ঋণ খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করা হবে। সেটাকে চেঞ্জ করে এখন আবার ২৭০ দিনের একটা বিধিতে পরিণত করার একটা প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। যেটা খুবই বিপর্যয়কারী সিদ্ধান্ত হবে।’
হাসনাতের দাবি, ঋণ খেলাপি ঘোষণার সময়সীমা বাড়ানো হলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তাই ৯০ দিনের বিধি কোনোভাবেই ২৭০ দিনে নেওয়া উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ ছাড়া গত ৩১ আগস্ট জারি করা পুনঃফসিলসংক্রান্ত একটি সার্কুলার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, ওই সার্কুলারে ডাউন পেমেন্টের হার গ্রাহক ও ব্যাংকের সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সুদ মওকুফের সুযোগ এবং পুনঃফসিলের মেয়াদ ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানকেও এর আওতায় আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
হাসনাত বলেন, এ ধরনের সুবিধা শেষ পর্যন্ত ঋণ আদায়ে কতটা সহায়তা করবে, তা নিয়ে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছেন। তার ভাষায়, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আবারও ‘ঋণ খেলাপি ফ্রেন্ডলি’ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে ২০ হাজার কোটি টাকার রুগ্ণ শিল্প পুনরুদ্ধার প্যাকেজ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত। তিনি বলেন, এ অর্থের কতটা ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে, তা তারা জানতে চেয়েছেন।
তার দাবি, ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৭২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানই ৩২ শতাংশ ঋণ পেয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এভাবে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন হাসনাত।
মূল্যস্ফীতি নিয়েও সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাজেটের পর মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ ছিল এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ সময় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন হাসনাত। তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
হাসনাত বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ না বাড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও বাড়বে না। ফলে সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জিত হবে, সে বিষয়ে তারা সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জানতে চেয়েছেন।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার ২৫ শতাংশ অর্জনের কথা থাকলেও কতটা অর্জিত হয়েছে, সে বিষয়ে তারা সরকারের কাছে জানতে চেয়েছেন।
হাসনাত জানান, এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে লিখিত তথ্য নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
এ ছাড়া ব্যাংক খাতে খেলাপি ও সংকটাপন্ন ঋণ কমাতে লিখিত সংস্কার প্রস্তাব জমা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে ৯০ দিনের ঋণ খেলাপি ঘোষণার বিধান ২৭০ দিনে না নেওয়া, ৩১ আগস্টের পুনঃফসিলসংক্রান্ত সার্কুলারের ১৮ মাসের এনপিএল রোডম্যাপ কমিটিতে উপস্থাপন এবং বড় ঋণের ক্ষেত্রে ওই সার্কুলারের প্রয়োগ স্থগিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
খেলাপি ও সংকটাপন্ন ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ঋণ না দেওয়ার বিষয়েও জোর দেন হাসনাত। পাশাপাশি পুনঃফসিল করা ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়িয়ে ঋণগ্রহীতাদের দ্রুত ঋণ পরিশোধে উৎসাহিত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
অর্থঋণ আদালতে থাকা বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়েও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তার দাবি, বর্তমানে অর্থঋণ আদালতে ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা রয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে আলাদা বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
সবশেষে সরকারের কাছে একাধিক প্রশ্ন করেও এখনো সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ার অভিযোগ করেন হাসনাত। তিনি বলেন, ‘তো আমরা সরকারের কাছে প্রশ্নই করে যাচ্ছি। প্রশ্নই করে যাব। তো আমরা উত্তরের প্রত্যাশা করছি। আশা করি নেক্সট মিটিংয়ে আমরা উত্তর পাব।’
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপিদের নতুন করে সুযোগ দেওয়া হলে তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ঋণ নিয়ে ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যান হওয়ার প্রবণতাও বন্ধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।