জবিতে ছয় মাসের সেমিষ্টার আট মাসে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বিভিন্ন অনুষদে সেশনজট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বেশিরভাগ বিভাগেই শিক্ষার্থীদের ছয় মাসের সেমিষ্টার শেষ হতে সময় লাগছে আট মাস। কোনো কোনো বিভাগের চিত্র আরও ভয়াবহ। ফলে শিক্ষার্থীদের চার বছর মেয়াদি স্নাতক শেষ করতে পাঁচ বছর এবং স্নাতকোত্তর শেষ করতে সাত বছরের বেশি সময় লাগছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সময়। তাদের অভিযোগ, একাডেমিক রুটিন অনুযায়ী ক্লাস-পরীক্ষা নিতে শিক্ষকদের অনীহা, স্বেচ্ছাচারিতা, সান্ধ্যকালীন কোর্সে বেশি সময় দেয়া, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে ব্যস্ততা এবং ক্লাসরুম সংকটের কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি। তবে সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয় সুত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন বিভাগ নাট্যকলায় সেশনজটের অবস্থা বেশি ভয়াবহ। নতুন বিভাগ হওয়ায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে সেকশন অফিসার না থাকায় বিভাগের প্রশাসনিক কাজও করতে হয় শিক্ষকদের। এরমধ্যে নবীন শিক্ষকরা পরীক্ষা সংক্রান্ত কার্যাবলী ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষ না হওয়ায় বিভাগটির একাডেমিক কার্যক্রমও চলছে ধীর গতিতে।
নাট্যকলা বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা দেড় বছর পিছিয়ে এখনো ৭ম সেমিস্টারে ক্লাস করছেন। ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এক বছর পিছিয়ে যথাক্রমে ৬ষ্ঠ ও ৫ম সেমিস্টারে আছেন। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও ইতোমধ্যে ছয় মাস পিছিয়ে পড়েছেন। এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের ছয় মাস মেয়াদী সেমিস্টার শেষ করতে আট মাস সময় লাগছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সেমিস্টারের নির্ধারিত ক্রেডিট ক্লাস শেষ হলেও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হচ্ছে না। এবিষয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর কয়েকবার লিখিতভাবে জানালেও সমাধান মিলেনি। এছাড়া বিভাগটিতে ক্লাসরুম সঙ্কটের কারণে এক ব্যাচের পরীক্ষা হলে অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ করে দাড়িয়ে থাকতে হয়। ক্লাসরুম সংকটের কারণে এই অবস্থা, যা সেশনজট বাড়াচ্ছে ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ই্ংরেজি বিভাগের সেশনজট সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের ক্লাস, পরীক্ষায় কোন ধরনের একাডেমিক রুটিন মানা হয় না। শিক্ষকরা তাদের ইচ্ছামাফিক ক্লাস নেন। একটি মিডটার্ম পরীক্ষায় সময় দিয়ে তিন থেকে চারবার সময় পেছানোর অভিযোগও আছে ইংরেজি বিভাগে। ফলে বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এক বছর জটে। এখনও মাস্টার্স ১ম সেমিষ্টারের ফলাফল দেয়া হয়নি। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা সাত মাস জটের কারণে এখনো মাস্টার্স ১ম সেমিষ্টারে। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও এক বছরের জটে। স্নাতক ৬ষ্ঠ সেমিষ্টারের ফলাফল না দেয়ায় ৭ম সেমিষ্টার পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হচ্ছে না। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় চলমান অন্যান্য ব্যাচ গুলোর সাথে পিছিয়ে পড়েছেন প্রায় সাত মাস। বিভাগটির প্রতি শিক্ষাবর্ষের ছয় মাস মেয়াদি এক সেমিষ্টার শেষ করতে গড়ে আট মাস করে সময় লাগছে।
কিন্তু ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হওয়া ইংরেজি বিভাগের সান্ধকালীন কোর্সের চিত্র উল্টো। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষা না নিয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্সের ক্লাস পরীক্ষায় ব্যস্ত। এছাড়া অধিকাংশ শিক্ষকই রাজধানীর বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন চাকরি করেন।
২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালুকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন নামে নতুন বিভাগটির অবস্থাও নাজুক। বিভাগটির প্রথম ব্যাচ ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এক বছর ও ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রায় সাত মাস পিছিয়ে পড়েছেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ১ম সেমিস্টার ১১ মাসে শেষ করে সবেমাত্র ২য় সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে।
ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা দেড় বছরের জটে রয়েছেন। এখনো মাস্টার্স ২য় সেমিস্টারের পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়নি তাদের। এছাড়া প্রায় আট মাস পিছিয়ে আছেন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের এক বছরের জটের ফলে বিভাগটিতে মাস্টার্স পর্যায়ে একই সাথে তিনটি ব্যাচের ক্লাস চলেছে। এতে তীব্র ভোগান্তী পোহাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
এদিকে রসায়ন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে দেড় বছর, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ছয় মাস, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ছয় মাস, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে চার মাসের সেশনজট রয়েছে। এছাড়া পরিসংখ্যান বিভাগে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ছয় মাস, আইন বিভাগে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের যথাক্রমে ছয় ও আট মাস, অর্থনীতি বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এক বছর ও ইতিহাসের ২০১৩-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ছয় মাসের সেশনজটে রয়েছেন। ফার্মেসী ও গণিত বিভাগের প্রায় সবকটি বিভাগেই ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত পিছিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
জবি নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান মো: কামাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের সেশনজটের বিষয়ে উপাচার্য মহাদয়ের সাথে কথা হয়েছে। আগামী মাসে সকল ব্যাচের পরীক্ষা নিয়ে সেশনজট কমিয়ে আনা হবে।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, সেশনজট দুর করতে সকল বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষার সময় ঘোষণা করে তারা এ সমস্যার সমাধান করবেন।