ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি © টিডিসি ছবি
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি পরিস্থিতি ও উত্তরণের পথ শীর্ষক এ সেমিনারে নীতিনির্ধারক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা খাতটির বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনার্জি অ্যান্ড লজিস্টিকস (সিইএল) আয়োজিত এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সম্প্রতি যাত্রা শুরু করা সিইএলের উদ্যোগে এটি ছিল অন্যতম আয়োজন।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সিইএলের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ড. সুলতান হাফিজ রহমান। তিনি ১৯৭০-এর দশকের বৈশ্বিক তেল সংকটের পর থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি গুরুতর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে কারণ আমরা আমাদের নিজস্ব সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। একই সঙ্গে আমরা ভেতরের সমস্যার সমাধান করতে বারবার বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভর করেছি। সিইএলের দায়িত্ব হবে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের এক সঙ্গে নিয়ে শিক্ষা, গবেষণা এবং নীতিগত পরামর্শের মাধ্যমে কার্যকর সমাধান তৈরিতে ভূমিকা রাখা।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। তিনি বলেন, আমদানিনির্ভর এবং ডলারে মূল্য নির্ধারিত জীবাশ্ম জ্বালানি বর্তমানে দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৯ হাজার ২৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা, আমদানিনির্ভরতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা ও গুরুত্ব তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহামেদুল করিম চৌধুরী। তিনি জ্বালানি নিরাপত্তাকে একটি লজিস্টিকস চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এলএনজি ও পেট্রোলিয়াম সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক এবং এ খাতের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। জ্বালানি খাতের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বৈচিত্র্য, বিকল্প ব্যবস্থা, মজুত সক্ষমতা, সংযোগ, তথ্যপ্রবাহ ও সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন আহামেদুল করিম চৌধুরী।
পরে ছয়জন আলোচকের অংশগ্রহণে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং সিইএলের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী।
এ সময় এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইএলের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের সদস্য আজম জে চৌধুরী বর্তমান সংকট মোকাবিলা ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর দ্রুত সংস্কার নিয়ে কথা বলেন।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সিনিয়র এনার্জি অ্যাডভাইজর সিদ্দিক জোবায়ের বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, গ্যাস অনুসন্ধান এবং কয়লাভিত্তিক জ্বালানি উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।
ওফানিক্স অ্যানালিটিকসের অ্যাক্টিং চিফ টেকনোলজি অফিসার এবং সিইএল ফেলো ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনার অভাব নিয়ে বক্তব্য দেন।
আরও দেখুন: ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের ডিরেক্টর শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন। অন্যদিকে, ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের প্রফেসর এবং সিইএল ফেলো ড. সেবাস্টিয়ান গ্রোহ দেশের প্রায় ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনকে কীভাবে সম্ভাবনাময় বিদ্যুৎ সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে বক্তব্য দেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপন এবং সমুদ্রের গ্যাস ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রমসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী এবং সিইএলের ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও সাবেক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ট্রেজারার আরিফুল ইসলাম এবং ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মুজিবুল হক।
আয়োজকদের মতে, এ সেমিনার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অঙ্গীকারকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে এসডিজি-৭ (সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি) এবং এসডিজি-৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো) অর্জনের সঙ্গে এ উদ্যোগ সরাসরি সম্পৃক্ত।