এনএসইউতে অভিবাসী রিপোর্টিং বিষয়ে সিএমএস ও আইএলও’র গণমাধ্যম অ্যাডভোকেসি কর্মসূচিতে © সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস) যৌথ উদ্যোগে অভিবাসী-কেন্দ্রিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন বিষয়ে একটি অ্যাডভোকেসি ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট হলে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে নৈতিক, অধিকারভিত্তিক ও জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার গুরুত্বের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়।
কর্মসূচিতে নির্বাচিত সাংবাদিক, শিক্ষক-গবেষক, অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়নকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসন বিষয়ে দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও সংবেদনশীল গণমাধ্যম প্রতিবেদন জোরদার করা, বিশেষ করে প্রত্যাবর্তী অভিবাসী শ্রমিকদের পুনঃএকত্রীকরণ ও সুরক্ষা চাহিদা এবং তাদের অবদানকে যথাযথভাবে তুলে ধরা।
কর্মসূচির সূচনা হয় সিএমএস ও এসআইপিজি-এর পরিচালক অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম. হক এবং আইএলও-এর ন্যাশনাল প্রজেক্ট ম্যানেজার রাহনুমা সালাম খানের স্বাগত ও উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে। অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম. হক একাডেমিয়া, গণমাধ্যম, আইএলও এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রমাণভিত্তিক অভিবাসন নীতি প্রণয়ন ও দায়িত্বশীল জনসংলাপ জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
অন্যদিকে রাহনুমা সালাম খান বলেন, অভিবাসন ও প্রত্যাবর্তী শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে সাংবাদিকতাকে সংবেদনশীলতার গণ্ডি ছাড়িয়ে কাঠামোগত বাস্তবতা, নীতিগত প্রেক্ষাপট এবং অভিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর নাসার ইউ. আহমেদ অভিবাসন শাসনব্যবস্থা বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক সংলাপ ও গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নীতিনির্ধারণ-সম্পর্কিত জ্ঞান উৎপাদন ও দায়িত্বশীল জনসংলাপের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে হবে।
‘একবিংশ শতাব্দীতে অভিবাসন’ শীর্ষক একাডেমিক প্রতিফলন উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও সিএমএস-এর সমন্বয়ক ড. সেলিম রেজা। তিনি বৈশ্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসন কাঠামোর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শ্রম অভিবাসনের গতিপথ বিশ্লেষণ করেন এবং বৈষম্য, ভূরাজনীতি ও উন্নয়ন বৈষম্যের প্রভাব তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে রাহনুমা সালাম খান শ্রম সংস্কার, অভিবাসন প্রবণতা, চালিকাশক্তি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রেক্ষাপটে অভিবাসন ও পুনঃএকত্রীকরণের গুরুত্ব বিষয়ে একটি বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, টেকসই পুনঃএকত্রীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অগ্রাধিকার, যার জন্য সমন্বিত নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জনসচেতনতা প্রয়োজন।
অধিকারভিত্তিক সাংবাদিকতা বিষয়ে বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য আসিফ মুনীর। তিনি অভিবাসী-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতার ভালো চর্চা তুলে ধরে স্টিগমা, ভুল তথ্য ও ঘাটতি-ভিত্তিক বর্ণনা পরিহারের আহ্বান জানান এবং বলেন, সাংবাদিকতাকে অভিবাসী শ্রমিকদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকারকে কেন্দ্র করেই গড়ে তুলতে হবে।
প্রশ্নোত্তর ও প্রতিফলন পর্ব পরিচালনা করেন আইএলও-এর ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর আব্দুল্লাহ আল মুইদ। এ পর্বে গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
আলোচনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যের আলোকে প্রত্যাবর্তী অভিবাসীদের সামাজিক সুরক্ষায় সীমিত প্রবেশাধিকার, জীবিকায় পুনঃপ্রবেশের সংকট এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার অভাব—বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে—নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নৈতিক ও অধিকারভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন স্টিগমা দূর করতে, অভিবাসীদের কণ্ঠকে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরতে এবং টেকসই পুনঃএকত্রীকরণ ও সামাজিক সংহতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মসূচিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশন মিডিয়ার প্রায় ১৫ জন সাংবাদিক, সিএমএস-এর শিক্ষক-গবেষক, আইএলও অংশীদার সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং অভিবাসন খাতের পেশাজীবীরা অংশগ্রহণ করেন। সমাপনী পর্বে নেটওয়ার্কিং ও সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসন বিষয়ে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক গণমাধ্যম চর্চা জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।