সেমিনারে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব © সৌজন্যে প্রাপ্ত
গেল ফ্যাসিস্ট সরকার আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বিভিন্ন অপমানজনক চুক্তি করেছে—এমন মন্তব্য করেছেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব। তিনি বলেছেন, স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টি একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ওসমান হাদী অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত “গণমানুষের ভাবনায় আগামী নির্বাচনের ইশতেহার” শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর যৌথ আয়োজনে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর এডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস-এর সভাপতি ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং এক কোণে মিয়ানমার অবস্থিত। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরেও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর কালো ছায়া নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। এসব চাপ থেকে জাতি মুক্তি চায়, যাতে আয়তনে ছোট হলেও প্রায় আঠারো কোটি মানুষের একটি গর্বিত জাতি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিগত এক দশকে রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় প্রতিটি নাগরিক রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও শিক্ষিত হয়েছে। জনগণ এখন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর নির্বাচনী ইশতেহার প্রত্যাশা করে। কেবল স্লোগান দিয়ে সামাজিক, জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়—এ বিষয়টি জনগণ ইতোমধ্যে উপলব্ধি করেছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনের ইশতেহার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুরোনো ধাঁচের আবেগনির্ভর ভাষা আর কার্যকর হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারের ইশতেহারে বাস্তবভিত্তিক চিন্তা, সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। একটি সুসংহত ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহার আগামী দিনের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গঠনে সহায়ক হতে পারে না।
সেমিনারে অন্যান্য আলোচকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আবদুল লতিফ মাসুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক ড. যুবাইর এহসান, অবসরপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) আশরাফ আল দ্বীন, প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারদিয়া মমতাজ, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য সাদিক আল আরমান, ডাকসু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং চিকিৎসক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরী।
আলোচকরা বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার কেবল প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার লিখিত অঙ্গীকার। তারা অতীতের চটকদার ও অবাস্তব প্রতিশ্রুতি পরিহার করে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাস্তববাদী ইশতেহার প্রণয়নের ওপর জোর দেন।
বক্তারা বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, প্রতিরক্ষা, তথ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সংস্কারের বিষয়গুলো ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তার পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ ও অযোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়নপ্রাপ্ত হওয়া নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পুরোনো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো অতিক্রম করে একটি জনগণকেন্দ্রিক, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আলোচকরা। তারা বলেন, জনগণের মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে প্রণীত কোনো ইশতেহারই টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আসন্ন নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন বক্তারা। সেমিনারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।