© ফাইল ফটো
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) তৃতীয় কার্যনির্বাহী সভায় গত বৃহস্পতিবার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার একটি সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। যদিও ডাকসুর গঠনতন্ত্রে ধর্মীয় ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ বলে কোনো ধারা নেই। প্রস্তাবিত ধারাটি গঠনতন্ত্রে সন্নিবেশিত করা হবে বলেও জানা গেছে।
১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদ ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী সংগঠনের তৎপরতা নিষিদ্ধ করেছিল এবং পরিবেশ পরিষদে এক সভায় ঢাবিতে শিবির ও জাতীয় ছাত্র সমাজের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যদিও বিগত বিএনপি জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে শিবিরের প্রকাশ্যে তৎপরতা দেখা গেছে। তবে, ডাকসুতে সিদ্ধান্ত গৃহিত হওয়ার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সারা দেশে চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি পক্ষ বলছে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সম্পর্কে ডাকসু যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক,অপরদিকে অন্য একটি পক্ষ বলছে ডাকসুর সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। কেউ কেউ আবার বলছেন, যদি এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় তাহলে তা জাতীয় রাজনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হবে।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপক্ষে একটি দল বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধের এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে আসেনি। ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই সব ছাত্র সংগঠন এ বিষয়ে একমত হয়ে কাজ করেছে। শহীদের রক্তস্নাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠাকালীন থেকেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় আন্দোলন করে আসছে। এখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আসলে বেমানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানবতায় বিশ্বাসী, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতির বিষয়টি আনলে গণতন্ত্রকে হরণ করা হয়। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবতার ভিতরেই রাজনীতির মূল্যবোধ । এতে আলাদা করে ধর্মকে নিয়ে আসার কিছু নেই। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে মানুষের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয় যা সবার জন্য ক্ষতিকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধি চিন্তার জায়গা। এখানে ধর্মে দিয়ে রাজনীতি করলে দ্বিমতের সৃষ্টি হবে।
অপর একটি পক্ষ বলছে, সাম্প্রদায়িকতা মানে হলো কোন নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে সুযোগ করে দেওয়া অথবা কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায় কে প্রাধান্য দেওয়া বা গুরুত্ব দেওয়া। তাদের মতে, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে সাংবিধানিকভাবে সবার রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। প্রত্যেকটি সংগঠন তার নিজ নিজ আদর্শ অনুযায়ী চলে। তাদের মতে, বাম সংগঠনগুলো চলে বাম আদর্শে, ধমীর্য় ভিত্তিক সংগঠনগুলো চলে ধর্মীয় আদর্শে। প্রত্যেকটি সংগঠনই তার নিজ নিজ দর্শনকে ধারণ করে। ধর্ম ভিত্তিক দলগুলোতে শুধুমাত্র ঐ ধর্মের লোকেরা রাজনীতি করতে পারবে এমনটা নয় । তারা শুধু একটি আদর্শ ধারণ করে আর তা হলো ধর্মীয় আদর্শ। তাদের মতে, তারা ধর্মীয় আদর্শকে ধারণ করে তারা গণতান্ত্রিক চর্চা করেন। ধর্ম মানেই সাম্প্রদায়িকতা নয় ।
তাদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বাহিরের কোনো জনপদ বা বিচ্ছিন্ন কোনো ভূখন্ড নয়। বাংলাদেশের ভূখন্ডের মধ্যে অবস্থিত দেশের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ। যেখানে বাংলাদেশের আইনে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি সেখানে বাংলাদেশের ভেতরের একটি অংশে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটতে পারে না। এ প্রস্তাব বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তটি সংবিধানের অন্তত ৮ টি অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে গণ্য করা যায়। অনুচ্ছেদগুলো হলো : ৭ এর ১,২, ২৮ এর ১ ও ৩ , ৩৭ , ২৬ এর ১ও ২ , ৩৬ , ৩৮ এর ক , খ, গ, ঘ , ৩৯ এর ১ ও ২ এর ক , ৪১ এর ১ এর ক, খ, এবং ৪১। বাংদেশের সংবিধানের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার ডাকসুর নেই।
ক্যাম্পাসে ধর্ম ভিত্তিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও বিগত ডাকসু নির্বাচনে ইশা ছাত্র আন্দোলন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয়। বৃহস্প্রতিবার ডাকসু অধিবেশনে ধর্ম ভিত্তিক ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ হবার পর ইশা ছাত্র আন্দোলন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তাদের মতে, ঢাবিতে পরিবেশ পরিষদে'র মাধ্যমে কয়েকটি সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষিত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চুড়ান্ত গঠনতন্ত্রে কোথাও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা উল্লেখ নেই।
বৃহস্প্রতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সভা শেষে ডাকসু সভাপতি ও উপাচার্য ক্যাম্পাসে ধর্মভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও চেতনার জায়গা। সুতরাং এখানে ধর্মভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চার সুযোগ নেই। তাদের কোনো ধরনের তৎপরতা ঐতিহ্যগতভাবে এখানে নেই। সেটি যেন কোনো ক্রমেই না ঘটে ।
ডাকসুর ভিপি নূরুল হক নূর বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি না থাকে তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কেন আছে। যেখানে জাতীয় রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন গুলোকে রাজনৈতিক দল মেনে নিয়েছে, নির্বাচন কমিশন বৈধতা দিয়েছে সেখানে আমরা কোন যুক্তিতে বিরোধিতা করবো। যদি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে সুযোগ না দেয়া হয় তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে তাদেরকে কেন সুযোগ দেওয়া হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি এমনটা হয় তাহলে তো জাতীয় রাজনীতির সাথে আমাদের রাজনীতি সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে। সেটার কারণে আমরা আসলে এটার বিরোধিতা করতে পারিনা।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল একেকটা দর্শন মেনে চলে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি মানে সাম্প্রদায়িকতা নয়। প্রত্যেকটা রাজনীতি একেকটা ফিলোসফি ধারণ করে। ধর্ম মানেই সাম্প্রদায়িকতা এঁটা আমি মনে করি না। সুতরাং ঢালাওভাবে যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কথা বলা হয়েছে তা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো একটা বিষয়।’
এবিষয়ে ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘শহীদের রক্তস্নাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠাকালীন থেকেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে সবসময় আন্দোলন করে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই মানবতার সুমহান আদর্শকে সকল ধরনের বৈষম্য নিরসনে নৈতিক অঙ্গীকারকে সবসময় ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে মূলনীতির একটি হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সামরিক শাসক অবৈধভাবে ধর্মীয় রাজনীতিকে সংবিধানে জায়েজ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামরিক শাসকের সময়ও ধর্মীয় ও সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ’
তিনি আরো বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন আমরা পরিবেশ পরিষদের বৈঠক করি তখন সকল সংগঠনের ধর্মভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করেছিলেন। আমরা মনে করি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে নিষিদ্ধের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের যে আশা আকাঙ্খা সে আশা-আকাঙ্খা আমরা সবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে চেয়েছি।’
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধি, মুক্ত চিন্তার জায়গা। এখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আসলে যায় না। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমরা মানবতায় বিশ্বাসী, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবতার ভিতরে আমাদের রাজনীতির মূল্যবোধ । এখানে আলাদা করে ধর্মকে নিয়ে আসার কিছু নেই। এতে আমাদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়, যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। পরিবেশ পরিষদে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রসমাজ নিষিদ্ধ ছিল অনেক আগে থেকেই। আমাদের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও আমাদের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। বিশ্ববিদ্যালয় একটি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র যেহেতু ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হবে। সেহেতু ধর্ম-বর্ণ বা কোনো জাতিকে কেন্দ্র করে মানুষকে পৃথক করা হয় এরকম জায়গা থেকে আমরা রাজনীতি চাই না। আমরা মনে করি এ সিদ্বান্তটি সঠিক।’
ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ফয়েজুল্লাহ বলেন, ‘আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করি। এই ক্ষেত্রে মতামত সবার থাকতে পারে। তবে সাম্প্রদায়িক শব্দটাকে যখন আমি নিয়ে আসি অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি যখন আমি টেনে নিয়ে আসব সেখানে গণতন্ত্রকে হরণ করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই পড়াশোনা করবে। এখন যদি কোনো ধর্ম ভিত্তিক সংগঠন তার ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করে সেখানে অন্য ধর্মের লোকজন বঞ্চিত হবে।’
ইশা ছাত্র আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ সাম্প্রদায়িকতা মানে কোনো নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে সুযোগ করে দেওয়া অথবা কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে প্রাধান্য দেওয়া বা গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু একটি আদর্শ ভিত্তিক সংগঠন তার নিজ আদর্শ অনুযায়ী চলে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কমিউনিস্টের আদর্শের উপর ভিত্তি করে চলে। প্রত্যেকটি সংগঠনই তার নিজ নিজ দর্শনকে ধারণ করে। ইসলামী শাসনতন্ত্রের শুধুমাত্র যে মুসলিমরা করবে তা কিন্তু নয়। আমাদের মধ্যে সকল ধর্মের কর্মীই আছে। আমরা কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমরা আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র দর্শনকে ধারণ করে রাজনীতি করছি। বামরা যদি রাজনীতি করতে পারে তাহলে আমরা কেন করতে পারবোনা।
ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি মনসুরুল আলম মনসুর বলেন, ‘ডাকসু থেকে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে আমরা সেই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা বলতে চাই, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে দেশের সকল মতের অনুসারী থাকতে পারে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসু সাহায্য করার কথা। কিন্ত তারা উল্টোটা করছে। এটা অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত।’