এনসিপির জাতীয় কনভেনশন
এনসিপির জাতীয় কনভেনশন © টিডিসি ফটো
জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট কোনো একক সমস্যার কারণে নয় বরং দীর্ঘদিন ধরে ভুল নীতি, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ও ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।
আজ রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলে ইন্সটিটিউট অফ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে জাতীয় কনভেনশনের দ্বিতীয় সেশনে এমন মতামত জানিয়েছেন বক্তারা। এই সেশনের আলোচনার বিষয় ছিলো, জ্বালানি নিরাপত্তা: বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যত করণীয়।
জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদক ইসমাইল আলী বলেন, গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও এর বড় অংশই ছিল আমদানি নির্ভর ও উচ্চ ব্যয়বহুল। এসব প্রকল্পের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার যথাযথ ভ্যালু অর্জিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হলেও বিদ্যুৎ খাতে কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা আসেনি। তার মতে, বড় কোম্পানিগুলোর সাথে স্বচ্ছ পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব, যা বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।
ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতি এই দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তিনি জানান, দেশে বর্তমানে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৮০ শতাংশের বেশি, যা আরও বাড়তে পারে। তিনি দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং রুফটপ সোলারের বিস্তার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন এবং বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বৃদ্ধিকে ‘লো হ্যাংগিং ফ্রুট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি সংকট মূলত নীতিগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতির ফল। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে, যা জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতে ভুল নীতি ও দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তার মতে, জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে বিদ্যুতের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং জনগণকে ভর্তুকির ভার বহন করতে হবে।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের মূল কারণ দুর্নীতি ও ভুল নীতি কাঠামো। তিনি দাবি করেন, জ্বালানি খাতে বিপুল আমদানি ব্যয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজেটকে প্রভাবিত করছে।
তিনি আরও বলেন, এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে উচ্চ ব্যয় দেশের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। তিনি জ্বালানি খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ উদ্যোগকে দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জ্বালানি সংকটকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত। তিনি বলেন, বৈশ্বিক শক্তি রাজনীতি ও সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরতা রাষ্ট্রকে ঝুঁকিতে ফেলে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতের বর্তমান কাঠামো উপনিবেশিক চিন্তার ধারাবাহিকতা বহন করছে। তার মতে, নতুন রাজনৈতিক ও নীতিগত কাঠামো ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয় এবং জ্বালানি খাতকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সেশন চেয়ার ও এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে সংস্কার ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও বলেন, জনগণ আর পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরতে চায় না। তার মতে, দুর্নীতি ও দলীয়করণের বাইরে গিয়ে একটি গুড গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব।