পেরুর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হোসে জেরি © সংগৃহীত
চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অফিশিয়াল শিডিউলের বাইরে গোপন বৈঠকের অভিযোগে অভিশংসিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন পেরুর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হোসে জেরি। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশটির কংগ্রেস ভোটাভুটির মাধ্যমে তাকে পদ থেকে অপসারণ করে।
গত বছর অক্টোবরে ‘নৈতিক অক্ষমতা’র অভিযোগে প্রেসিডেন্ট দিনা বোলুয়ার্তে অভিশংসিত হলে জেরি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি কংগ্রেসের স্পিকার ছিলেন। বোলুয়ার্তে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে অভিশংসিত নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেদ্রো কাস্তিয়োর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের পর থেকে জেরি ছিলেন পেরুর সপ্তম প্রেসিডেন্ট, যা দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতারই প্রতিফলন।
জেরির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ‘চিফা-গেট’ নামে পরিচিতি পায়। পেরুভিয়ান-চাইনিজ ফিউশন খাবার ‘চিফা’কে ঘিরেই এই কেলেঙ্কারির সূত্রপাত। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে হুডি পরে ব্যবসায়ী ঝিহুয়া ইয়াংয়ের রেস্টুরেন্টে বৈঠক করছেন জেরি। পেরুর আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের প্রতিটি অফিশিয়াল কার্যক্রম নথিবদ্ধ করার কথা থাকলেও এই বৈঠকের কোনো তথ্য সরকারি সূচিতে উল্লেখ ছিল না। পরে তাকে ইয়াংয়ের পাইকারি দোকানেও দেখা যায়।
ঝিহুয়া ইয়াং এমন একজন ব্যবসায়ী, যিনি সরকারি নজরদারিতে ছিলেন এবং একটি বড় জ্বালানি প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়েছিলেন। আরও জানা যায়, ওই বৈঠকে এমন এক চীনা নাগরিকও উপস্থিত ছিলেন, যিনি অবৈধ কাঠ পাচার চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে গৃহবন্দি ছিলেন।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের পাশাপাশি জেরির বিরুদ্ধে নৈতিক অনিয়মের অভিযোগও ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে প্রেসিডেন্টের সরকারি প্রাসাদে কয়েকজন নারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাদের নামে সরকারি চুক্তি বরাদ্দ করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় অ্যাটর্নি জেনারেল দুর্নীতির তদন্ত শুরু করলে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে।
যদিও জেরি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন, শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে তার বিরুদ্ধে সাতটি অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। ভোটাভুটিতে ৭৫ জন আইনপ্রণেতা তাকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন, ২৪ জন বিপক্ষে ভোট দেন এবং তিনজন বিরত থাকেন। আইনপ্রণেতা রুথ লুক বলেন, ‘নাগরিকরা হুডি পরা নেতা কিংবা গোপন স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি আর দেখতে চায় না।’
বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য কংগ্রেসে ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিল পেরুতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে জুন মাসে দ্বিতীয় দফা ভোট হবে। বর্তমানে অন্তত ৩৬ জন প্রার্থী প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
গত এক দশকে পেরুর বেশিরভাগ প্রেসিডেন্টই কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি বা ‘নৈতিক অক্ষমতা’র অভিযোগে পদচ্যুত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অভিশংসনের এই সাংবিধানিক পথটি অত্যন্ত অস্পষ্ট হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়ছে।
এরই মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকার্রা ঘুষ নেওয়ার দায়ে ১৪ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। পেদ্রো কাস্তিয়ো বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের মামলায় ১১ বছর ৫ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। ২০২২ সালে অভিশংসনের মুখে পড়ে কাস্তিয়ো স্বঘোষিত ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে, যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে অপসারণ করা হয়।