সিএনএনের প্রতিবেদন
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন , ছবি - রয়টার্স © টিডিসি
বাংলাদেশে জেন জি বিপ্লবের পর আগামী বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে জুলাই আগস্টে সংগঠিত আন্দোলনের পর দেশের কোটি কোটি তরুণের স্বপ্ন ছিলো দেশের অতীতের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসবে ও নতুন পথে এগিয়ে যাবে। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৬ বছর দেশের ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাক হেলিকপ্টারযোগে পালিয়ে যান। আন্দোলনকারীরা তার সরকারি বাসভবন দখলে নেন। যা সারা বিশ্বে আলোড়ন তৈরি করে এবং নেপাল ও মাদাগাস্কারে দুর্নীতি ও পক্ষপাতের বিরুদ্ধে জেন জি আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে। নির্বাচনে জালিয়াতি ও কারচুপি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও আন্দোলন দমনে কঠোর নীতির জন্য অভিযুক্ত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটায় সন্তোষ প্রকাশ করেন নাগরিকরা। হাসিনা উৎখাতের আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী মির্জা শাকিল বলেন, বিপ্লব দেখিয়েছে জেন জি কী করতে পারে।
হাসিনা পরবর্তী যুগে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য নেতা যাদের ভাবা হচ্ছে, তারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের থেকে তাদের বয়সের ব্যবধান অনেক, তবে তারাও জীবন-ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন। তাদের একজন ৬০ বছর বয়সী রাজনীতিবিদ, যিনি কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী একটি পরিবারে জন্মেছেন। অন্যজন ৬৭ বছর বয়সী ইসলামী নেতা, যার দল থেকে নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী নেই।আন্দোলনে সক্রিয় থাকা সাদমান মুজতবা রাফিদ বলেন, আমরা এমন দেশ চেয়েছিলাম যেখানে লিঙ্গ, বর্ণ বা ধর্ম নির্বিশেষে সবার সমান সুযোগ থাকবে। আমরা নীতি পরিবর্তন ও সংস্কারের আশা করেছিলাম, কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা আমাদের স্বপ্নের সাথে মিলছে না।
হাসিনার পতন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে ছাত্র আন্দোলন থেকে। এর প্রতিক্রিয়ায় তার সরকার নির্মম ও রক্তক্ষয়ী দমন নিপীড়ন চালায় আন্দোলনকারীদের ওপর। যা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে এবং আরও মানুষকে রাস্তায় নামায়। আন্দোলন শীঘ্রই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের একপর্যায়ে সেনাবাহীনি জানায় তারা আন্দোলনকারীদের গুলি করবে না, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে হাসিনার শাসন শেষ। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতা শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন দখল করে নেয়। ফলে শেখ হাসিনাকে প্রতিবেশী ভারত চলে যেতে বাধ্য করা হয়।
গত নভেম্বর, ঢাকার একটি আদালত আন্দোলন চলাকালে ভূমিকার জন্য হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আন্দোলনে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়েছে বলে অনুমান করেছে। হাসিনার কারণে এখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক। বিরাজ করছে। বাংলাদেশ চায়, হাসিনার বিচারের জন্য ভারত তাকে হস্তান্তর করুক। যদিও শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দল আওয়ামী লীগকে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
হাসিনা এবং তার দলের অনুপস্থিতিতে তার ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী, বিএনপির জন্য সুবিধাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির নেতা, তারেক রহমান, প্রয়াত খালেদা জিয়ার ছেলে এবং হাসিনার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৭ বছরের নির্বাসনের পর বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন তিনি। এখন তাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়াও পুরনো প্রজন্মের আরেকটি দল, জামায়াত ইসলামী নিজেদের শক্তির জানান দিচ্ছে। জামায়াত দেশের বৃহত্তম ইসলামী দল, যারা হাসিনার শাসনকালে বছরের পর বছর দমন-নিপীড়নের পর সরাসরি রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। যা দলটির জন্য পুর্নজীবন পাওয়ার মতো।
এদিকে বিপ্লবের পর ছাত্রদের প্রতিষ্টিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের বিভাজিত এবং সহিংস রাজনৈতিক অঙ্গনে কার্যকরভাবে স্থান করে নিতে সংগ্রাম করছে। ডিসেম্বরে শেষের দিকে, এনসিপি অনেকটা চমক দিয়ে জামায়াতে ইসলামী সঙ্গে নির্বাচনী জোট ঘোষণা করে। লন্ডনের সোয়াস (এসওএএস) বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়নের অধ্যাপক নওমি হোসেন বলেন, এই জোট নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়েছে। কারণ এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কয়েকটি আসনে নির্বাচনে জিতে আসার সুযোগ পাবে। এছাড়া দেশটির সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশে সংসদ সদস্য পদ একধরনের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে ভয় আছে সংসদে না গেলে তাদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
প্রার্থীদের এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচিত হয়েছে। দেশে এই অস্থিতিশীলতা আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশার ঠিক উল্টো। আন্দোলনকারীদের একজন নাজিফা জান্নাত বলেন, এনসিপি সংস্কার, অন্তর্ভুক্তি এবং আরও অনেক কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একজন নারীকে প্রার্থী করছে না এমন একটি দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াটা বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হচ্ছে।
তবুও, অনেকেই এই নির্বাচনকে দীর্ঘ সময় পর প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে দেখছেন। ঢাকার সড়কগুলোতে নির্বাচনের আবহ দেখা যাচ্ছে। আন্দোলনকে অংশ নেওয়া শাকিল বলেন, আমরা প্রত্যাশা করছি নির্বাচনের পর দেশে পরিবর্তন আসবে।