বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন © টিডিসি ফটো
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, বিভিন্ন গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানের পর্যালোচনা বা জরিপ, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী জনসভায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং মাঠের বাস্তবতার নিরিখে বিএনপি জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছে দাবি করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, সারা দেশে ধানের শীষের গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, ধানের শীষের নিরঙ্কুশ বিজয় সুনিশ্চিত, ইনশাআল্লাহ। আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকালে গুলশানে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি এ দাবি করেন।
জনগণ বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ী করবে দাবি করে মাহদী আমিন বলেন, ধানের শীষ মার্কায় মানুষ নির্বিঘ্নে, নির্দ্বিধায় ভোট দেবেন কারণ বিএনপি একমাত্র দল, যেটি একাধারে একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, পঁচাত্তরের আধিপত্যবাদবিরোধী সার্বভৌম অবস্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থান এবং চবিবশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক পালাবদলে আর কোনো রাজনৈতিক দলের এমন গৌরব নেই। আর তাই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একমাত্র বিএনপিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র তথা জনগণের ক্ষমতায়নকে সর্বাঙ্গীণভাবে আলিঙ্গন করে।
তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশে আমাদের যে সত্তা ও অস্তিত্ব, যেমন : নারী, যুবক ও প্রবাসীদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ফ্রি পড়াশোনা, সবচেয়ে বেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে লিবারেল ইকোনমিক পলিসি, অর্থনৈতিক খুঁটি তথা গার্মেন্টস শিল্প এবং জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স অর্জন; শিল্প, কৃষি ও শিক্ষা বিপ্লব, নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও গণশিক্ষা কর্মসূচি, জনগণের বহুল আকাঙ্ক্ষিত বহুদলীয় ও সংসদীয় গণতন্ত্র, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ এবং খাল খনন কর্মসূচি, রাষ্ট্র পরিচালনার এই প্রতিটি কালজয়ী উদ্যোগ বিএনপির পূর্ববর্তী সরকারের সময়ই নেওয়া হয়েছিল। সরকার পরিচালনার সময় দেশের মানুষের সেবা করার এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আর কোনো রাজনৈতিক দলের নেই।
মাহদী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সত্যিকারের যে দুইজন বিশ্বনন্দিত রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, তারা বিএনপির হয়ে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হওয়া এই নেতৃত্বের কারণে, আজ ধানের শীষে মিশে আছে তাদেরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসা।
তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সত্যিকার অর্থে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো নেতা যদি একজন থাকেন, তাহলে তিনি কে? সবাই একটি উত্তরই বলবেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর কোনো রাজনৈতিক দলে এমন কোনো নেতৃত্ব নেই, যাকে দল-মত, শ্রেণি-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে, সর্বজনীনভাবে দেশের সত্যিকার নেতা হিসেবে মানুষ মনে করা হয়। তিনি দেশজুড়ে প্রতিটি সভায় যখন ছুটে গিয়েছেন, তখন কীভাবে জনগণের জোয়ার নেমে এসেছে। কীভাবে জনতা তাকে দেখতে রাস্তায় নেমে এসেছে, তার সাথে হাত মেলাতে এগিয়ে এসেছেন অসংখ্য মানুষ। নেতৃত্বের প্রতি এই ভালোবাসা, এই আস্থা, আর কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের প্রতি নেই।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এই মুখপাত্র বলেন, বিএনপিই ফ্যাসিবাদবিরোধী ১৬ বছরের আন্দোলনে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। নিজ নামে, নিজ পরিচয়ে লড়াই করে গিয়েছে। গুম-খুন, হামলা-মামলা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও সবচাইতে বেশি শহীদের সংখ্যা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিএনপিই সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে। জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য সাংগঠনিকভাবে, তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির প্রতিটি নেতা ও কর্মী দেশের মানুষের জন্য এভাবেই লড়ে গিয়েছে। হাজারো শহীদের রক্তে রঞ্জিত, শত সন্তানহারা মায়ের ভালোবাসায় আপ্লুত দল বিএনপি আজ পরিণত হয়েছে গণমানুষের ভালোবাসায়।
তিনি বলেন, বিএনপি সবার আগে ভিশন-২০৩০ প্রণয়ন করেছিল ২০১৬ সালে। যেখানে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিলেন আমাদের নেতা তারেক রহমান। আজকে বাংলাদেশের সংস্কার নিয়ে যা কিছু আলোচনা, তার প্রতিটির মৌলিক ভিত্তি যেমন ৩১ দফায় রয়েছে, ঠিক তেমনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, রাষ্ট্র ব্যবস্থাসহ প্রতিটি বিষয়ে রয়েছে বাস্তবসম্মত ও টেকসই দিকনির্দেশনা। বিএনপিই একমাত্র দল, যার রয়েছে প্রতিটি সেক্টরের সেই সুবিস্তৃত রূপকল্প, যা অনুরণিত হয়েছে বিএনপির সম্প্রতি ঘোষিত ইশতেহারে এবং যেটি আজ দেশব্যাপী সমাদৃত। বিদ্যমান দলগুলোর মধ্যে একমাত্র বিএনপিরই রয়েছে একাধিকবার দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা, রয়েছে বাস্তবসম্মত, টেকসই ও জনসম্পৃক্ত পরিকল্পনা।
মাহদী বলেন, শুধু নারীদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠাই না, গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমে নারীদেরকে কর্মক্ষম করে তোলা, সরকারী এবং বেসরকারী ক্ষেত্রে নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা, মেয়েদের জন্য বৃত্তি এবং অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নে বিএনপি অনন্য। আর তাই তো বেগম খালেদা জিয়াকে ধরা হয় বিশ্বব্যাপী নারীর ক্ষমতায়নের রোল মডেল হিসেবে। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী যে রাজনৈতিক দল, তারা নারীদের বিষয়ে প্রতিনিয়ত অশালীন বক্তব্য দিচ্ছে, নারীর অধিকার এবং স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে চাচ্ছে, কর্মঘণ্টাকে কমিয়ে আনতে চাচ্ছে। যেখানে সবচেয়ে বেশি নারী সংসদ সদস্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তারা একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি। স্বাভাবিকভাবেই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী যে নারী, তারা সেই রাজনৈতিক দলটির নারী বিদ্বেষী আচরণে মর্মাহত, সংক্ষুব্ধ।
তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক দলটি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, আজকে সেই দলটির প্রধানই বলছেন, তিনিও নাকি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। যে দলটি প্রতিটি পদে-পদে নারী বিদ্বেষী আচরণ করছে, তারাই আবার নারীদেরকে ভোট চাওয়ার জন্য ঘরে-ঘরে পাঠাচ্ছে। যে দলটির নামের সাথে ইসলাম আছে, তারা ইসলামকে অপব্যবহার করে জান্নাতের টিকিট বিক্রির মাধ্যমে, ধর্মীয় অপব্যাখ্যায় মানুষকে প্রলুব্ধ করার মাধ্যমে, বিভিন্ন মিথ্যা ও বানোয়াট উক্তির মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাদের প্রকাশিত ইশতেহারেও আমরা সেই দ্বিচারিতার প্রমাণ দেখতে পাই। তারা রাস্তাঘাটে ভারতবিরোধী অবস্থানের কথা প্রকাশ করলেও, ইশতেহারে দেশের এত ছবি থাকা সত্ত্বেও, অসংখ্য ভারতীয় ছবি ব্যবহার করেছে, যা ব্যাখ্যাতীত।
তাদের এই দ্বিচারিতা ও প্রতারণার ছায়া দেখা গেছে প্রচারণার ক্ষেত্রেও। একজন অভিনেতা অভিযোগ করেছেন, একটি সামাজিক অভিযোগ গ্রহণকারী অ্যাপের বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের কথা বলে তাকে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করছেন, যা রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর।
মাহদী বলেন, সেই রাজনৈতিক দলটির যিনি প্রধান, তিনি প্রায়ই তুই-তোকারি ও তুমি ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি সম্বোধনের স্বীকৃত শিষ্টাচার ও ভাষাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। এটি পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষক ও বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সাথে পরিচয় ঘটে বাংলাদেশের মানুষের। গত ৫৫ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করে, বিএনপিই সেই রাজনৈতিক দল, যেটি দেশের প্রতিটি সংকটকালে জনগণের সাথে ছিল, জনগণের পাশে ছিল, সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে, সংগ্রাম করেছে। হয়ত কোথাও সীমাবদ্ধতা ছিল, হয়ত সব কাজ সঠিক হয়নি, তবে সেগুলোকে সংশোধনের মাধ্যমেই জনগণের যে আস্থা রয়েছে এবং ধানের শীষের প্রতি মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা আছে, তাকে ধারণ করেই ইনশাআল্লাহ ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হবে গণমানুষের দল, তৃণমূলের ক্ষমতায়নের দল বিএনপি। দেশের প্রতিটি শ্রেণি ও পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নিয়েই বিএনপি গঠন করবে পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার, ইনশাআল্লাহ।