সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান © টিডিস ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে মহেশখালীর বাহারছড়াস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা মাঠে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এক নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আজ সোমবার দুপুরে জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যে এলাকা যতটা বঞ্চিত, সে এলাকাকে আগে উপরের দিকে টেনে তোলা হবে। আমি এখানে আসছিলাম আর আকাশ থেকে দেখছিলাম, এখানে আল্লাহ তায়ালা প্রচুর নিয়ামত দান করেছেন। কিন্তু আমি বহু উপজেলা টাউন ভিজিট করেছি, এরকম বিধ্বস্ত, গরিব, পিছিয়ে পড়া টাউন আর চোখে পড়েনি। এত নিয়ামত আল্লাহ দান করলেন, এই এলাকা কেন পিছিয়ে পড়বে? আমি আপনাদের কথা দিয়ে যাচ্ছি, আপনারা আমার ভাই হামিদুর রহমান আযাদের হাতে আপনাদের আমানত বুঝিয়ে দিন। আমরা আপনাদের আস্থার প্রতিদান দেব ইনশাআল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, এই মহেশখালীকে একটি স্মার্ট ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আল্লাহ তায়ালার সাহায্য নিয়ে যা করা দরকার তা করা হবে। তখনই যুবকদের কর্মসংস্থান হবে, আর বেকার ভাতার চিন্তা করতে হবে না। কাজ করবে যুবক-যুবতী, কাজ করবে মুসলমান, কাজ করবে হিন্দু, কাজ করবে বৌদ্ধ, কাজ করবে খ্রিস্টান- দল-ধর্মের কোনো ভেদাভেদ দেখা হবে না, দেখা হবে যোগ্যতা ও দেশপ্রেম।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের পরিবর্তনের কারণে আজকে আমাদের এখানে আসতে পারা। এই মহেশখালীর শহীদ তানভীর সিদ্দিকী- তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তারা রক্ত না দিলে বাংলাদেশ তার গভীর অমানিশা থেকে বের হতে পারত কি না, সন্দেহ। তানভীর সিদ্দিকী এবং তার সহযোদ্ধারা যারা এই লড়াই-সংগ্রামের অংশ ছিলেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
শফিকুর রহমান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশ স্বাধীনভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, আমরাও তার অন্তর্ভুক্ত হব। এই জমিনের আর কারও কাছে বন্ধক রাখা হবে না। আমি যে জিনিসগুলো বলছি এখন, আপনারা ‘জি’ বললেন- এগুলোই বাস্তবায়নের জন্য গণভোট। ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখ প্রথম ভোট হবে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জোয়ার তুলতে হবে।
আলহামদুলিল্লাহ, এই জোয়ার উঠে গেছে। একসময় যারা মুখ লুকিয়ে ছিলেন, তারা এখন বাধ্য হয়ে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছে। ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে যারা অবস্থান নেবে, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ ধরে নেবে তারা আবারও ফ্যাসিবাদ চায়। ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে যারা অবস্থান নেবে, বাংলাদেশের মানুষ ধরে নেবে তারা আবারও পরিবারকেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালু করতে চায়।
আমাদের যুবকদের স্লোগান ছিল- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমার অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই, আমার অধিকার আমি চাই। নাগরিক হিসেবে মেধা-যোগ্যতা অনুযায়ী আমার ন্যায্য অংশ চাই।
তিনি বলেন, এটি ছিল আমাদের যুবকদের দাবি। তোমরা তো মিছিল করে দাবি করো নাই- আমাকে বেকার ভাতা দাও। আপনারা করেছিলেন, যুবকরা? বাংলাদেশের কোথাও করেনি। তারা বলেছে, আমাদের হাতে কাজ দাও। আমরা আমাদের দেশ-জাতিকে গড়তে চাই। দেশ গড়ায় অবদান রাখতে চাই। এজন্য আমরা যুব সমাজকে অপমানজনক বেকার ভাতা দিতে চাই না, সম্মানজনক কাজ তুলে দিতে চাই।
জামায়াতের আমির আরও বলেন, কাজ তুলে দেওয়ার একটি পটেনশিয়াল মহেশখালী-কুতুবদিয়া। এখানে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর- এটিকে কেন্দ্র করে আমরা সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের চেয়েও ভালো মানে নিয়ে যেতে পারব। আমাদের দেশের মানুষ অনেক ভালো। বিশ্বের একটি প্রসিদ্ধ দেশ ১৪ ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছিল। সেখানে ১৪ ঘণ্টার ভেতরে সাড়ে ৭০০ ব্যাংক ডাকাতি হয়েছিল, সাড়ে ৬ হাজার মায়ের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হয়েছিল।
ঘরে ঘরে লুটতরাজ শুরু হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে ১৪ ঘণ্টার মাথায় সেনাবাহিনী নামাতে হয়েছিল। আর আমাদের দেশে ২০২৪-এর পাঁচ, ছয়, সাত, আট আগস্ট- মোট চার দিন কোন সরকার ছিল না। আমাদের কোনো ব্যাংক ডাকাতি হয়েছিল? ঘরদুয়ার লুট হয়েছে? দোকানপাট খালি করে ফেলা হয়েছে? মানুষ খুন হয়েছে? মায়েদের ইজ্জত লুণ্ঠন হয়েছে? কিছুই হয়নি। আমাদের মানুষ অনেক ভালো। আমাদের মাথাগুলো পচা। জাতির নেতৃত্ব যারা দিয়েছিল, তারা পচা। ওই পচা জায়গাটা ঠিক করতে এসেছি। মাথা ঠিক তো সব ঠিক। নেতৃত্ব ঠিক—সব ঠিক।
নেতৃত্ব যদি চাঁদাবাজ, ব্যাংক ডাকাত হয়, এদের দিয়ে আগামীর বাংলাদেশ ঠিক হবে না। যুবকদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়া যাবে না। যাদের মধ্যে চরিত্রবল আছে, সততা আছে, দেশপ্রেম আছে, যারা মানুষের সঙ্গে লেগে থাকে সুখে-দুঃখে- বসন্তের কোকিল নয়- বাংলাদেশ গড়া হবে তাদের দিয়ে ইনশাআল্লাহ।
তিনি যুবকদের উদ্দেশে বলেন, হে, যুবক বন্ধুরা, তোমরা তৈরি হয়ে যাও। এই বাংলাদেশ আমরা তোমাদের হাতে তুলে দেব ইনশাআল্লাহ। যুবকরা থাকবে বাংলাদেশ নামক উড়োজাহাজের ককপিটে ক্যাপ্টেন হিসেবে, আমরা থাকব প্যাসেঞ্জার সিটে। এই বাংলাদেশটাই আমরা চাই। এই বাংলাদেশ হামাগুড়ি দিয়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনে যাবে- সেটি আমরা চাই না। বাংলাদেশকে এখন জাম্প করতে হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা মনে করি, এটি সম্ভব।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের যে পরিমাণ টাকা লুণ্ঠন করে পাচার করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে তার পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। তা বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের চার গুণ। এটি কার টাকা? আপনাদের টাকা, জনগণের টাকা- চোরেরা, লুণ্ঠনকারীরা বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি, ওদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ওটা বের করে আনব ইনশাআল্লাহ। এবং সেই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। তারপর ইনসাফের ভিত্তিতে সারা বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে। আর কোনো বেইনসাফি এখানে হবে না, হতে দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিসভার সদস্য- উন্নয়নের জোয়ার তার বাড়িতে, আর সব জায়গায় মরুভূমি- এই কাজ আর বাংলাদেশে হতে দেওয়া হবে না ইনশাআল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, এই সমাজ ব্যর্থ হয়েছে মায়েদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে। মায়েদের ঘরে, চলাচলে, কর্মস্থলে পর্যাপ্ত সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আল্লাহ যেন সেই তৌফিক আমাদের দান করেন। আজকে অনেকগুলো কর্মসূচি আমাদের রয়েছে, প্রাণভরে কথা বলতে পারলাম না। অতৃপ্তি নিয়ে যাচ্ছি। কথা দিচ্ছি, আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখলে আবার আসব ইনশাআল্লাহ- আবার নয়, বারবার আসব।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জয়-পরাজয় আল্লাহর হাতে, আসমান-জমিনের মালিকের হাতে। যেকোনো মূল্যে আমাকেই জিততে হবে- এটি ১১ দলের দর্শন নয়। জনগণের কলিজা ও হৃদয় জয় করে ভালোবাসা-সমর্থন, স্বচ্ছ ভোট নিয়ে ১২ তারিখের পর ১৩ তারিখ থেকে নতুন বাংলাদেশের উদয় হবে ইনশাআল্লাহ। সেই বাংলাদেশ গড়ার গর্বিত অংশীদার হবেন আমার মহেশখালীবাসী ভাই-বোনেরা। আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, আপনার নিরাপত্তা, আপনার গর্বের বাংলাদেশ। সেদিন সবাই বলবে- আমিই বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ গড়ায় আমিও অংশীদার।
তিনি বলেন, মাত্র ৫টি বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মানচিত্র পাল্টে দেওয়া সম্ভব। চুরি হবে না, চাঁদাবাজি হবে না, লুণ্ঠন হবে না। দেখবেন, আপনারা যদি এই জায়গাতে ভোট দেন, বাংলাদেশ বদলে গেছে ইনশাআল্লাহ। মতলববাজরা আমার-আপনার চেয়ে অনেক বেশি ধূর্ত। যখন দেখবে যে এখানে তাদের জায়গা নেই, তোমাদের বদলাতে হবে- তোমরা যেদিন বদলে যাবে, তোমাদেরকে মোবারকবাদ। তোমার হাতেও আমরা মর্যাদার কাজ তুলে দেব। কারণ তুমিও বাংলাদেশ।
তিনি আরও বলেন, আমরা এই জাতিকে আর বিভক্ত করতে চাই না। আমরা ঐক্যবদ্ধ জাতি চাই- আমাদের স্লোগান হচ্ছে ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’। আপনারা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চান? জনতার জবাব- ‘হ্যাঁ’। তাহলে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন। আর একটা কথা বলে যেতে চাই- আমরা শুধু নিজেদের বিজয় চাই না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে সেখানে আমি-আপনি কেউই বাদ পড়ব না। আর গোষ্ঠী, পরিবারের বিজয় হলে- জাতির ওপর তাণ্ডব চালানো হয়- এই বিজয় আমাদের প্রয়োজন নেই। আপনারা আছেন তো? ইনশাআল্লাহ? থাকবেন? আমাদের সঙ্গে থাকবেন- আপনাদের সেই ত্যাগের, কাজের প্রতিদান দেব ইনশাআল্লাহ।