তরুণ ভোট যাবে কোন বাক্সে, তাদের পক্ষে টানতে বিএনপি-জামায়াতের কৌশল কী?

৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৭ AM
তরুণ ভোটার

তরুণ ভোটার © সংগৃহীত

বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। বিশ্লেষকদের মতে, জয়-পরাজয়ের হিসাব নির্ধারণে এই তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্ত একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও তরুণ ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে নানামুখী কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে।

নতুন ভোটারদের মধ্যেও ভোট নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। তরুণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই ধারণা পাওয়া গেছে। দশ বছর আগে ভোটার হলেও আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনুষ্ঠিত দুটি একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে ভোটকেন্দ্রে যাননি তুনাজ্জিনা জাহান। বর্তমানে তার বয়স ২৮ বছর। বয়সের হিসেবে অনেক আগেই ভোটার হলেও এবারের নির্বাচনেই প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন বলে মনে করছেন তিনি।

প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতার অপেক্ষায় থাকা তুনাজ্জিনা জাহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, নিরাপত্তা দেবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে—তিনি তাদের পক্ষেই ভোট দেবেন।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ, যা মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

এবারের নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে এসেছে বিএনপি ও তাদের পুরোনো জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও নির্বাচনের মাঠে রয়েছে, যারা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে শরিক হয়েছে।

রাজনীতির এই নতুন বিন্যাসে তরুণ ভোটারদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা আগেভাগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না বলে মত বিশ্লেষকদের। তবে তারা মনে করছেন, তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বড় একটি অংশের তরুণ ভোটার গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। ফলে এবারের নির্বাচন অনেক তরুণের জন্য প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের দৃশ্যমান ভূমিকা।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় তরুণ ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। তারা দ্রুত মত বদলাতে সক্ষম এবং সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এগিয়ে। তাই এই তরুণরা শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা আগেভাগে অনুমান করা কঠিন। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তাদের মন বোঝা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তারা আরও বলছেন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র বা ইতিহাসের ভূমিকা অস্বীকার না করলেও তরুণদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে—আগামী দিনে তাদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ঋদ্ধি দাস বলেন, “আমি প্রার্থীর অতীত দেখব। তারা আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো পূরণ করেছে কিনা, কথার সঙ্গে কাজের মিল আছে কিনা—এসব দেখব। ভবিষ্যতে তারা আমাদের জন্য কী করবে, সেটাকেই আমি প্রাধান্য দেব।”

বিশ্লেষকদের মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা কতটা কর্মমুখী হবে, দক্ষতা উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পরিবেশ, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান—এই বিষয়গুলো তরুণদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিগত অবস্থান, সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের রূপরেখার দিকেই তরুণদের নজর থাকবে।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সব তরুণই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। এর বাইরের তরুণ জনগোষ্ঠীও নির্বাচনের হাওয়া বদলে দিতে পারে। তাই শেষ পর্যন্ত তরুণরা কাকে বেছে নেবে, তা বলা কঠিন।’

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের সরব উপস্থিতি থাকায় এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে তরুণরা দল ও প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছেন, মতামত দিচ্ছেন এবং সমালোচনাও করছেন।

প্রথমবার ভোট দিতে আগ্রহী তুনাজ্জিনা জাহান বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এখন একজন প্রার্থীর সব দিক জানা যায়—তার ব্যক্তিগত জীবন, বিশ্বাসযোগ্যতা। যে প্রার্থী তরুণদের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেবে এবং যার ব্যাকগ্রাউন্ড পরিষ্কার, সে যে দলেরই হোক, তাকেই আমি ভোট দেব।’

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ তরুণ ভোটারদের আচরণ ও সিদ্ধান্ত এখনও ভিন্ন বাস্তবতায় পরিচালিত হচ্ছে। গ্রামে অনেক তরুণ-তরুণী পরিবারে প্রবীণ সদস্য, স্বামী কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংগঠনের সিদ্ধান্তের পথেই ভোট দেন।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ২০ বছর বয়সী শারমিন আক্তার এবারই প্রথম ভোট দেবেন। তবে তিনি এখনো কাকে ভোট দেবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। শারমিন বলেন, ‘ভোট কীভাবে দিতে হয়, সেটাও আমি ঠিক জানি না। কাকে ভোট দেব, সেটাও বুঝি না। বাবা-মা বা আশপাশের মানুষ যাকে বলবে, সম্ভবত তাকেই দেব।’

দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনের মাঠে সক্রিয়ভাবে ফিরেছে বিএনপি। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দলটি ইতিবাচক রাজনীতি ও ভবিষ্যতমুখী প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দিচ্ছে। গত ২৫ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকে বিএনপির রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দলটি জনভোগান্তি সৃষ্টি না করে মিছিল-মিটিং, প্রতিশোধ ও কটূক্তির রাজনীতি থেকে সরে এসে দায়িত্বশীল রাজনীতির কথা বলছে।

তরুণ ভোটারদের টানতে বিএনপি স্লোগান দিয়েছে, ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের পক্ষে হোক।’ যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক ইশতেহার প্রকাশ করেনি দলটি, তবে ক্ষমতায় এলে ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ভাতা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি আইটি পার্কে তরুণ উদ্যোক্তাদের অফিস স্পেস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের অর্থ দেশে আনার বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি ও আউটসোর্সিং সম্প্রসারণের কথাও বলছে দলটি।

তরুণদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে বিএনপি তাদের ভ্যারিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত থিম সং, ভিডিও, রিলস ও ফটোকার্ড প্রকাশ করছে। 

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ধরনের অপপ্রচার বা চরিত্রহননে দলটি যুক্ত হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক রাজনীতি করতে চাই। তরুণদের কাছে আমাদের বার্তা—আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বাস্তবসম্মত সংস্কার চাই।’

বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বিএনপির দীর্ঘদিনের নিপীড়িত হওয়ার ইতিহাসও তরুণ ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে পারে।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-শিবিরের প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় রাজনৈতিক চাপে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনকে রাজনৈতিক পুনরুত্থানের সুযোগ হিসেবে দেখছে। দলটি জুলাইয়ের চেতনার পাশাপাশি ধর্মীয় আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছে।

জামায়াতের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিত কনটেন্ট আপলোড করে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। দলটি তাদের পলিসি ডায়ালগে পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ গঠন, জেলা পর্যায়ে জব ইয়ুথ ব্যাংক, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার তৈরি এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। জামায়াত মূলত কল্যাণমূলক রাজনীতির মাধ্যমে তরুণদের কাছে পৌঁছাতে চাইছে। তবে দলটির নারী নীতি ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে ভীতি ও প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এবারের নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতৃত্ব ও প্রার্থীদের বড় অংশই তরুণ হওয়ায় তাদের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণদের প্রত্যাশা। মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রধান প্রচার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে দলটি। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স ও টিকটকে ভিডিও, গ্রাফিকস, লাইভ, রিলস এবং থিম সং প্রকাশ করা হচ্ছে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন বলেন, ‘আমরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এবং শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে দুটি থিম সং করেছি। এসব গান নিয়ে রিলস প্রতিযোগিতা হবে। ৩০টি আসনের প্রার্থীদের নিয়েও আলাদা ভিডিও বানিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে।’

এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ জানান, ইশতেহারে কর্মসংস্থান, কর্মমুখী শিক্ষা, বেকার ভাতা ও নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা আর শুধু একটি ভোটব্যাংক নন; বরং তারা রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার একটি শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে সামনে এসেছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট…
  • ১২ মার্চ ২০২৬
সাময়িক বহিষ্কার হওয়া ঢাবির সেই ৮ শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্ক…
  • ১২ মার্চ ২০২৬
বিসিবির প্রধান নির্বাচক হচ্ছেন সুমন, সহকারী পদে আলোচনায় ২ ন…
  • ১২ মার্চ ২০২৬
সংসদের কোন সারির কোন আসনে কে বসছেন
  • ১২ মার্চ ২০২৬
ফেসবুকে জাবি ছাত্রীকে অশালীন মন্তব্য, এক ছাত্র বহিষ্কার
  • ১২ মার্চ ২০২৬
উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ দিচ্ছে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভ…
  • ১২ মার্চ ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
22 April, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081