মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ © সংগৃহীত
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। ২৬৮ আসনে দলীয় প্রার্থীদের হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। শুরু থেকেই একবক্স নীতিতে এগিয়ে চলছিল ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় চরমোনাই পীরের দল।
এতদিন এক সঙ্গে পথচলার পরেও কেন সমঝোতা ভেস্তে গেল সেই প্রশ্ন এখন সবার মনে। বিষয়টি নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস।
আজ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) একান্ত আলাপকালে জোট ভেঙ্গে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ জানান তিনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব বলেন, বিভিন্ন কারণে ধাপে ধাপে সংশয় ও সন্দেহ তৈরি হচ্ছিল। এভাবে চলতে থাকলে দল বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে মনে হয়। বিশেষ করে আসন বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হতে হতে এমন পর্যায়ে চলে এসেছিল যে, আরও এক দিন দেরি হলে তাদের মনোনয়ন দাখিলই অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে তড়িঘড়ি করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিল করতে বলা হয়। কেননা আর ঝুলে থাকার সুযোগ ছিল না।
তিনি বলেন, যদি আরেক দিন আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে অপেক্ষা করা হতো, তাহলে পুরো নির্বাচনী অংশগ্রহণই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেত। সংগঠনকে এভাবে ঝুলিয়ে রেখে ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে তা মেনে নেওয়া যায় না, কারণ সংগঠন অনেক কষ্টে গড়ে তোলা হয়েছে। সে কারণে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও ৩০০ প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করা সম্ভব হয়নি।
ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, যখন পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল এবং বিভিন্ন ধরনের সংশয় সৃষ্টি হচ্ছিল, তখনই তারা মনোনয়ন দাখিলের সিদ্ধান্ত নেন। এক বা দুইটি নয়, বহু বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। এক পর্যায়ে দল উপলব্ধি করে,এভাবে চলতে থাকলে সংগঠন অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে। এ কারণে আমাদের সব ফোরামে—মজলিসে আমেলা, মজলিসে শূরা, মজলিসে খুদ্দাম এবং উপদেষ্টা পরিষদে বারবার বৈঠক করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সংগঠনকে এত বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলা ঠিক হবে না।
ইসলামী আন্দোলন ভুল পথে যাচ্ছে কি না এ বিষয়ে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলেম-ওলামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিয়ে হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে থেকেই কাজ করতে চাই এবং ইসলামের পথে চলতে চান। সেখান (শীর্ষ আলেম-ওলাম) থেকে পরামর্শ এসেছে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে সমঝোতায় থাকাটা ইসলামের জন্য এবং দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই কারণেই শেষ পর্যায়ে এসে একটি ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে দলের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে।
আসন বণ্টন প্রসঙ্গে মহাসচিব বলেন, অনেকে বলছেন আমরা জোটের কাছে ১০০টি আসন চেয়েছি, বিষয়টি এমন নয়। সমঝোতার অংশ হিসেবে যখন আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, দলের অবস্থান কোথায় কী অবস্থায় আছে, তখন জরিপ করে এ ক্যাটাগরি, বি ক্যাটাগরি, দুর্বলতা ও শক্তি সবকিছু খুলে বলা হয়েছিল। বিপরীতে জামায়াতের কাছেও গকই তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটি ‘গোপন বিষয়’ বলে আজ পর্যন্ত দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, যে আসনগুলোকে এ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছিল, সেগুলোতে জয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছিল। কিছু আসনকে বি প্লাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে প্রতিপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে তারা পরিষ্কার তথ্য পাননি।
নির্বাচনী সমঝোতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০ তারিখ পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে, তাই এখনও সমঝোতার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে বর্তমান অবস্থানে তারা আপাতত যেখানে আছেন, সেখানেই থাকছেন এবং পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে বলও জানান এই নেতা।
শরিয়ত আইন বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ ইউনুছ আগেও বলেছিলেন যে ক্ষমতায় এলে ধীরে ধীরে, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী শরিয়তভিত্তিক বিধান বাস্তবায়ন করা হবে একসঙ্গে সবকিছু করা সম্ভব নয়। তবে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে যে জামায়াত তাদের অবস্থান থেকে সরে আসছে, যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, এক খ্রিস্টান প্রতিনিধির সামনে বলা হয়েছিল যে ‘পরিচালিত নিয়মে রাষ্ট্র চালানো হবে’ এবং ওই প্রতিনিধি বলেছেন যে তিনি শরিয়ত আইন বাস্তবায়ন করবেন না এতে তারা আশ্বস্ত হয়েছেন। কিন্তু এতে করে শরিয়ত আইন বাস্তবায়নের আগ্রহে ঘাটতি রয়েছে—এমন বার্তা প্রকাশ পেয়েছে, যা পরে জামায়াতের মুখপাত্র জুবায়ের স্পষ্ট করেছেন যে সবকিছু হবে জনগণের চাহিদার আলোকে।
তিনি বলেন, যদি শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা হতো যে প্রথমে পরিচালিত নিয়মে এবং পরে ধীরে ধীরে শরিয়তভিত্তিক আইন বাস্তবায়ন করা হবে, তাহলে এমন বিভ্রান্তি তৈরি হতো না। যেহেতু তারা একটি ইসলামী দল, তাই শরিয়ত আইন বাস্তবায়নের বিষয়টি অস্পষ্ট রাখায় অহেতুক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
সমঝোতা ভেঙে যাওয়াশুধুই আসনভিত্তিক ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অতীতে বহুবার বিভিন্ন সরকার ও দলের পক্ষ থেকে তাদের কাছে নানা ধরনের প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু তারা কখনো সেগুলো গ্রহণ করেননি। তাই শুধুমাত্র আসন বণ্টনই সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার একমাত্র কারণ—এমনটা বলা যায় না।