জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের লোগো © টিডিসি ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া প্রার্থীদের বড় অংশই উচ্চশিক্ষিত। মনোনয়ন বৈধ হওয়া প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট প্রার্থীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশের বেশি স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রায় ৯৪ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত। বিএনপিতে এই হার প্রায় ৮১ শতাংশ।
৩০০ আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে মোট ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়। শেষ পর্যন্ত জমা পড়ে ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকে প্রার্থী হতে চান ২ হাজার ৯০ জন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন ৪৭৮ জন। যাচাই-বাছাই শেষে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন।
বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের হলফনামা অনুযায়ী, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৩৯৮ জন। এর মধ্যে ৫২২ জন স্নাতক, যা মোট প্রার্থীর ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ৮৭৬ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, যা মোট প্রার্থীর ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা মোট প্রার্থীর ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
এ ছাড়া উচ্চমাধ্যমিক পাস প্রার্থী রয়েছেন ১৭৪ জন (৯ দশমিক ৪ শতাংশ) এবং মাধ্যমিক পাস প্রার্থী রয়েছেন ১১১ জন (৬ দশমিক ১ শতাংশ)। হলফনামায় ১৫৯ জন প্রার্থী বা মোটের ৮ দশমিক ৬ শতাংশ নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিকের কম উল্লেখ করেছেন, যাঁরা ‘স্বশিক্ষিত’ বলে জানিয়েছেন।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির ২০০ জন প্রার্থী স্নাতকোত্তর বা সমমানের ডিগ্রিধারী এবং ৫৭ জন স্নাতক বা সমমান ডিগ্রিধারী। সব মিলিয়ে দলটির প্রায় ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত। এ ছাড়া দলটির ৮ জন উচ্চমাধ্যমিক, ৬ জন মাধ্যমিক এবং ৩ জন প্রার্থী মাধ্যমিকের কম বা স্বশিক্ষিত বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মোট ২৯১ জন প্রার্থীর মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী রয়েছেন ২৩৫ জন, যা দলের মোট প্রার্থীর ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১০৮ জন স্নাতক এবং ১২৭ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ২২ জন উচ্চমাধ্যমিক, ১৮ জন মাধ্যমিক এবং ১৬ জন মাধ্যমিকের কম বা স্বশিক্ষিত বলে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: শিক্ষার্থীদের হাতে আটক চবির আওয়ামীপন্থি শিক্ষক রোমান শুভ
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৭১ জন বা ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে ৪৯ জন স্নাতক এবং ১২২ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। দলটির ২৩ জন উচ্চমাধ্যমিক, ১২ জন মাধ্যমিক এবং ২০ জন প্রার্থী মাধ্যমিকের কম বা স্বশিক্ষিত বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
জাতীয় পার্টির ১৪৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮২ জন বা প্রায় ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে ৫১ জন স্নাতক এবং ৩১ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। দলটির ২৪ জন প্রার্থী নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিকের কম বা স্বশিক্ষিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) মোট প্রার্থীর ৫৯ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। দলটির ৭৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৬ জনের স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতের হার আরও বেশি; প্রায় ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ। দলটির ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৫ জন স্নাতকোত্তর এবং ১৩ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও উচ্চশিক্ষিতদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ১১৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ৯২ জন বা প্রায় ৭৮ শতাংশ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে ৪৮ জন স্নাতকোত্তর এবং ৪৪ জন স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংসদ সদস্যরা উচ্চশিক্ষিত হলেই যে ভালো করবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত অনেকেই উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। তার মতে, একাডেমিক শিক্ষার চেয়ে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা এবং সততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, এখন এমএ পাস করেও মানুষ ছোট চাকরির জন্য লাইন ধরছে। সংসদ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রার্থীর উপস্থিতি খুব ভালো সংবাদ; এমনটি বলা যায় না। বরং আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন প্রজ্ঞা ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ।
প্রসঙ্গত, দেশের সংবিধানে সংসদ সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। তবে গত বছর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সালাহউদ্দিন রিগ্যান।