বেগম খালেদা জিয়া © সংগৃহীত
বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম হয় তার বাবা ইস্কান্দর মজুমদারের কর্মস্থল জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি নামের একটি ছোট শহরে। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট মজুমদার পরিবারে আসে আনন্দঘন মুহূর্ত। ইস্কান্দর মজুমদার ও বেগম তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্ম নেয় তাদের কন্যাসন্তান। মা–বাবার মতোই শিশুটির গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল ও দুধে-আলতা। নতুন সদস্যের আগমনে পরিবারজুড়ে বইতে থাকে আনন্দের আবহ।
বড় বোন খুরশীদ জাহান আঁতুড়ঘরে গিয়ে সদ্যোজাত বোনকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। ছোট বোন বিউটি তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। খুরশীদ তাকে জাগিয়ে জানায়, ‘চলো বিউটি, আমাদের খুব সুন্দর একটা বোন হয়েছে।’ আড়াই বছরের বিউটি হঠাৎ এ খবরে বিস্মিত হয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে আঁতুড়ঘরে যায়। নতুন বোনকে দেখে আনন্দে সে বলে ওঠে, ‘ও আমার পুতুল, আমি ওর সঙ্গে খেলব।’
এই আনন্দঘন মুহূর্তে বাবা ইস্কান্দর মজুমদার মিষ্টি আনতে বের হন। খুশির খবর পেয়ে পরিবারের বন্ধু ও চিকিৎসক ডাক্তার অবনীগুহ নিয়োগিও সেখানে উপস্থিত হন। উঠান থেকেই তিনি মজুমদার সাহেবকে ডেকে বলেন, ‘আগে মিষ্টি চাই। মেয়েটির জন্ম এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে শান্তি ফিরে এসেছে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়েছে। তাই এর নাম শান্তি রাখা যেতে পারে।’
সেই নবজাতক শিশুটিই আজকের বেগম খালেদা জিয়া। মায়ের স্নেহ ও বোনদের আদরে তার শৈশব কাটতে থাকে। জন্মের সাত দিন পর আত্মীয়স্বজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তার আকিকা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বাবা তার তৃতীয় কন্যার আনুষ্ঠানিক নাম রাখেন খালেদা খানম। তবে ডাকনাম নির্ধারণে দেখা দেয় ভিন্নমত। পারিবারিক চিকিৎসকের পছন্দ ছিল ‘শান্তি’, বাবা দিয়েছিলেন ‘টিন্সি’, আর মেজো বোন বিউটি শুরু থেকেই তাকে ডাকত ‘পুতুল’ নামে। শেষ পর্যন্ত বিউটির দেওয়া নামটিই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। সেই দিন থেকেই খালেদা জিয়ার ডাকনাম হয়ে যায় ‘পুতুল’।
খালেদা জিয়ার জন্মকালে জলপাইগুড়ি ছিল শান্ত ও মনোরম একটি শহর। সেই সময়ের স্মৃতি আজও স্মরণ করেন তার মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। ১৯৯০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘পুতুলের জন্মের আগে চারদিকে যুদ্ধের আতঙ্ক ছিল। মানুষ কেবল যুদ্ধের কথাই বলত। পুতুল জন্ম নেওয়ার পর যুদ্ধও শেষ হলো। আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক ও প্রতিবেশীরা বলতেন, পুতুল খুব সৌভাগ্যবান। জন্মের দিন থেকেই আমার মেজো মেয়ে বিউটি ওকে পুতুল বলে ডাকত। ও ছিল তার সারাক্ষণের খেলার সঙ্গী।’
আরও পড়ুন: ৬ষষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস
ইস্কান্দর মজুমদার পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ফেনী থেকে জলপাইগুড়িতে যান এবং সেখানে চা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। তার পৈতৃক নিবাস ফেনীর শ্রীপুর থানার ফুলগাজী গ্রামে। তিনি ফুলগাজীর সুপরিচিত মজুমদার পরিবারের সন্তান। দেশভাগের পর তিনি সপরিবারে জলপাইগুড়ি ছেড়ে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান।
খালেদা জিয়া দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি মূলত পারিবারিক জীবনেই মনোযোগ দেন। স্বামী সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে কিংবা রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ও তাকে প্রকাশ্য রাজনীতিতে খুব একটা সক্রিয় দেখা যায়নি। রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি ছিল সীমিত।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ হন। এ ঘটনার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চরম সংকটে পড়ে। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে তৈরি হয় নেতৃত্বশূন্যতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। সে সময় বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করেন, দলের ঐক্য ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় জিয়া পরিবারের কাউকে সামনে আনা প্রয়োজন। দলের নেতাকর্মীদের অনুরোধ ও চাপের মুখে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হতে শুরু করেন খালেদা জিয়া।