অনার্স শেষ না করেই ঢাবি ছেড়েছিলেন সৈয়দ হক, কেন?

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:২১ AM
সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো হয়নি, তবে পৃথিবীর পাঠশালায় তিনি ছিলেন এক সফল ছাত্র। আজ সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। আবহমান বাংলা ও বাঙালির অন্যতম সেরা এই ভাষাশিল্পী ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে তিনি প্রায় ৪ মাস লন্ডনে ফুসফুসের ক্যান্সার রোগে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সালটা ১৯৫৭। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ। কয়েকদিন ধরেই শিক্ষক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন জন মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ পড়াচ্ছিলেন। একদিন হঠাৎ করেই ওই কাব্যেরই একটি দিক নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের লিখতে দিলেন। সঙ্গে দিলেন সহায়ক কিছু বইয়ের সূত্র; সেখান থেকে নেয়া তথ্যের আলোকেই লিখবেন শিক্ষার্থীরা। সবই ঠিক ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো সৈয়দ হকের বেলায়। শিক্ষকপ্রদত্ত সূত্রের পরোয়া করলেন না তিনি। লিখলেন নিজের বোধবুদ্ধি ও মেধা খাঁটিয়ে। যার ফল মারাত্মক হলো। খাতা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন শিক্ষক। বললেন, ‘তুমি আমার পরামর্শমতো সূত্র ব্যবহার করোনি, উদ্ধৃতি দাওনি, লিখেছ নিজের মতো করে।’

ইংরেজিতে তিনি সৈয়দ হককে বললেন, ‘..অ্যান্ড ইফ ইউ গো অন লাইক দিস, ইউ ক্যান নট হোপ টু গেট আ ফার্স্ট ক্লাস ইন ইয়োর ফাইনাল!’ (যদি এভাবেই চলতে থাকো, ফাইনালে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার আশা ছেড়ে দাও)। শিক্ষকের এমন কথায় ছাত্র তাৎক্ষণিক উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ফার্স্ট ক্লাসের জন্য আসিনি। ক্লাস কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে শেখায় না। আপনার অনুমতি পেলে আমি কি এই মুহূর্তে আপনার ক্লাস এবং বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে পারি?’ এভাবেই স্নাতক পাসের আগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাপ্তি টানেন সৈয়দ শামসুল হক। [তথ্যসূত্র: বিশ্ব যাঁর বিশ্ববিদ্যালয়-পিয়াস মজিদ]

সৈয়দ শামসুল হক নিজেই বলেছেন, দু’এক জায়গায় লিখেছেনও, লেখকমাত্র খুনি। না, হাতে তীক্ষ্ম তরবারি নিয়ে কারও গলায় চালিয়ে দেন না গল্পকার, ফিনকি দিয়ে বের হয় না টাটকা রক্ত। কিন্তু গল্পকার তবুও খুনি। গল্পকার কেন খুনি? পাঠকের মনের আস্তিনে লুকিয়ে রাখা রিরংসাকে গল্পকার বের করে আনেন চাতুর্যের ঘোড়ায় চড়ে, চরম দক্ষতায়, নিমিষে পাঠককে নিয়ে যান রক্তমাখা তেপান্তরের মাঠে। দাঁড় করিয়ে দেন উন্মুক্ত কৃপাণের সামনে, যে কৃপাণ একদিন নিজেই ধার দিয়েছিলেন, অন্যকে বধ করবার জন্যে!

লেখক আনিসুল হক তাকে নিয়ে বলেছেন, ‌‌‘তিনি যদি অন্য সব বাদ দিয়ে দুটো বই লিখতেন ‘পরানের গহীন ভেতর’ এবং ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’ তাহলে এ দুটো বই তাকে অমর করে রাখত। তিনি যদি শুধু তার কাব্যনাট্যগুলো লিখতেন ‘নুরলদিনের সারাজীবন’ এবং ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ তাহলেও আমরা চিরদিনের জন্য তাকে বাংলা সাহিত্যে স্মরণ করতে বাধ্য থাকতাম। তাঁর কবিতা-নাটক-কলাম সবটা মিলিয়ে যে ব্যক্তিত্বটি দাঁড়ায় তা তুলনারহিত’।

কবি অধ্যাপক মোহাম্মদ সামাদের মতে, সৈয়দ হক তাঁর কবিতা দিয়ে বারবার সাড়া ফেলেছেন। ‘‘কবিতায় তার ধারাবাহিকভাবে যে অবদান তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সৈয়দ হককে অনুসরণ করে আমাদের কালের কবিরা বা তার পরবর্তী কালের কবিরা আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন। তার 'খেলারাম খেলে যা' অনুকরণ করে আমাদের কথাসাহিত্যিকেরা লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ হকের অবদানকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই’’।

২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ সালে কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ শামসুল হক। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প তথা সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য সৈয়দ হককে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়। যিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলে। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুলে। ১৯৫০ সালে গণিতে লেটার মার্কস নিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

বাবার ইচ্ছা ছিল তাঁকে তিনি ডাক্তারি পড়াবেন। বাবার এ রকম দাবি এড়াতে তিনি ১৯৫১ সালে বম্বে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেকের বেশি এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। পরের বছর দেশে ফিরে এসে জগন্নাথ কলেজে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী হিউম্যানিটিজ শাখায় ভর্তি হন। কলেজ পাসের পর ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে স্নাতক পাসের আগেই সেখান থেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বেরিয়ে আসেন।

এর কিছুদিন পর তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ প্রকাশিত হয় । সৈয়দ হক সাহিত্যসাধনার জন্য বহু পুরস্কার পেয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৬৬, একুশে পদক ১৯৮৪, চিত্রনাট্য, সংলাপ রচনা ও গীতিকার হিসাবে বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ইত্যাদি।

ফায়জুর রহমান লিখেছেন, সৈয়দ হকের গল্পে উঠে এসেছে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের জীবনচিত্র। বয়ানের ঢং, বিষয় ও প্রকরণের বৈচিত্র্যে গল্পগুলো যেমন পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনি আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। ভুলভাবে সমালোচিতও হয়েছে বারবার। তবুও তাঁর ছন্দময় গদ্যের আলপথে হেঁটে পাঠক যখন গল্পে প্রবেশ করে, তখনই তাঁর গল্প বলার গতি ও ভঙ্গির মায়ায় পড়ে যায়। আর সে মায়াময় পথে তিনি বাক্য থেকে বাক্যে গড়িয়ে নেন পাঠককে। ক্রিয়াপদের নিপুণ স্থাপনে পাঠককে দোলা দেন কখনো এখানে কখনো ওখানে।

সৈয়দ হকই আমাদের শিখিয়েছেন গল্পে ক্রিয়াপদের বিবিধ ব্যবহার। ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপ, সাধারণ অতীত কালরূপ ও পুরাঘটিত অতীত কালরূপের ব্যবহার দেখিয়েছেন গল্প কথকের জনপদে দাঁড়িয়ে। পথপ্রদর্শকের ভূমিকায়।

শুধু কি ক্রিয়াপদের ব্যবহার? শব্দের সচেতন ব্যবহারে, গল্পের কাঠামোগত বৈচিত্র্য, বিষয়ভাবনার দুঃসাহসিকতা ও অনন্য উপস্থাপনশৈলীর মাধ্যমে একনিষ্ঠ জীবনপাঠে এগিয়েছেন তিনি। নাগরিক জীবনযন্ত্রণার নানা অভিক্ষেপ, মধ্যবিত্তের অস্তিত্বের অভিনব সংকট, জাতিসত্তার ক্রম জাগরণ, মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনের ঘাত-প্রতিঘাতে সমকালীন জীবনচেতনা তাঁর গল্পকে করেছে বর্ণময়। তাঁর গল্প বলার ঢংয়ে সময়ের ক্যানভাসে সাধারণের জীবনকে আঁকতে গিয়ে, তাদের ভাষায় বলতে গিয়ে, আন্তরিক ও সাবলীল বর্ণনায় আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার করেছেন নিপুণভাবে। যে অঞ্চলের গল্প লিখেছেন, ঠিক সেই অঞ্চলের ভাষা বলেছেন, শুদ্ধতার সাথে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, তাঁর গল্পের ভাষাশৈলী পরবর্তী গল্পের সাথে মিল নেই; যার মাধ্যমে বোঝা যায় তিনি শব্দ প্রয়োগে সচেতন ছিলেন। যার ব্যাখ্যা তিনিই দিয়েছেন : ‘চিত্রকর কত মাধ্যমেই না ছবি আঁকেন। কোনো ছবি জল রঙে, কোনো ছবি তেল রঙে, কোনোটি বা শুধু কালি ও কলমে। লেখকেরাও অবিকল তাই। একেক গল্পের জন্য একেক ধরনের বাক্য গঠন শব্দচয়ন তাকে ভেবে নিতে হয়। গল্প আর ভাষা’।

প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সৈয়দ হকের জন্মস্থান কুড়িগ্রামে আজ তার সমাধিতে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনসহ আলোচনা সভা, র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের অপ্রকাশিত রচনা নিয়ে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স্‌ আজ দুটি গ্রন্থ প্রকাশ করতে যাচ্ছে। এর একটি কাব্যগ্রন্থ ‘নুন-পূর্ণিমা’ অপরটি কবির ভাষান্তরে ‘আফ্রিকান ও অন্যান্য অনুবাদ কবিতা’।

আজ বিকেল ৫টায় ধানমণ্ডির বেঙ্গল বই প্রাঙ্গণে নবীন-প্রবীণ সাহিত্যানুরাগীদের উপস্থিতিতে গ্রন্থ দুটির প্রকাশনা উৎসব হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ‘সৈয়দ শামসুল হক তৃতীয় প্রয়াণবর্ষ স্মরণার্ঘ্য’ শিরোনামে সন্ধ্যা ৭টায় জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চায়ন করবে সৈয়দ শামসুল হক রূপান্তরিত উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বিশ্বখ্যাত নাটক ‘হ্যামলেট’।

বাংলার নবম, বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভ…
  • ০৯ মে ২০২৬
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ওষুধ সংকট
  • ০৯ মে ২০২৬
মীনা বাজার নিয়োগ দেবে এক্সিকিউটিভ, আবেদন ২০ মে পর্যন্ত
  • ০৯ মে ২০২৬
জনবল সংকটে রাজবাড়ীর ডাকঘরে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত
  • ০৯ মে ২০২৬
সন্তানদের বাঁচিয়ে আগুনে পুড়ে মারা গেলেন বাবা-মা
  • ০৯ মে ২০২৬
সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি ২ যুবক নিহত
  • ০৯ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9