জন ক্রেগ ভেন্টার: যিনি জীবনের লিপি লিখেছিলেন

জন ক্রেগ ভেন্টার ও ইনসেটে লেখক

জন ক্রেগ ভেন্টার ও ইনসেটে লেখক © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

বিজ্ঞানের জগৎ সাধারণত প্রথাগত নিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এখানে উন্নতি পরিমাপ করা হয় দশকে আর খ্যাতি তৈরি হয় ধীরস্থির মতৈক্যের ভিত্তিতে। তবে প্রতি প্রজন্মান্তরে এমন একজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে, যিনি তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তায় বিজ্ঞানের চিরাচরিত ভিত্তি নাড়িয়ে দেন। বৈজ্ঞানিক মহলের কাছে তিনি ছিলেন এক ‘বিদ্রোহী’ বা মাভেরিক। আর সাধারণ মানুষের কাছে এক দূরদর্শী জাদুকর, যিনি জীবজগতকে দেখতেন ডিজিটাল খেলার মাঠ হিসেবে। জে. ক্রেগ ভেন্টার, যিনি জীবনকে কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, বরং পুনর্লিখনযোগ্য এক সফটওয়্যার কোড হিসেবে দেখার সাহস করেছিলেন। গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোতে তিনি ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

বায়োটেকনোলজি বা জীবপ্রযুক্তির এই অকুতোভয় মহীরুহের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি এই নিবন্ধটি লিখছি। তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের শিখিয়েছে প্রথাগত চিন্তার গণ্ডি পেরিয়ে অজানাকে জয় করতে। সিন্থেটিক বায়োলজি (কৃত্রিম জীববিজ্ঞান) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মেলবন্ধনে মানবজাতির জন্য এক নতুন পৃথিবী গড়ার যে ভিত্তি তিনি স্থাপন করে গেছেন, তা চিরস্মরণীয়। তাঁর মহাপ্রয়াণ আধুনিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং রূপান্তরকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালো।

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইতেও তিনি ছিলেন নির্ভীক এবং স্বচ্ছ। তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান নয়, বরং জীববিজ্ঞানের ‘বিপ্লবী রূপান্তর’-এর একটি যুগের সমাপ্তি। যারা বর্তমানে এআই বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁদের জন্য ভেন্টারের উত্তরাধিকার বুঝতে হলে গবেষণাগারের চার দেয়াল ছাড়িয়ে সেই মানুষটির হৃদয়ে তাকাতে হবে, যিনি ‘অসম্ভব’ শব্দটিকে কোনো বাধা নয় বরং একটি সমাধানযোগ্য কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখতেন। এক অশান্ত যুবক থেকে শুরু করে কৃত্রিম প্রাণের স্থপতি হয়ে ওঠার এই যাত্রা আধুনিক বিজ্ঞানীদের জন্য এক অনন্য ব্লুপ্রিন্ট। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মানবজাতির নেতৃত্ব দিতে হলে বর্তমানের প্রথাগত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস থাকতে হয়। তাঁর এই বিদ্রোহী সত্তা কোনো শ্রেণিকক্ষে জন্মায়নি, বরং জন্মেছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতায়।

আরও পড়ুন: ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: ভাষাতত্ত্বের মহাপণ্ডিত থেকে ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক

১৯৪৬ সালে ইউটার সল্টলেক সিটিতে জন্ম নেওয়া ভেন্টার কোনো মেধাবী ছাত্র ছিলেন না। পাঠ্যবইয়ের চেয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউয়ের মাঝেই তিনি জীবনের অর্থ খুঁজতেন। কিন্তু ১৯৬৭ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর মেডিকেল কোরে যোগ দেওয়া তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ভিয়েতনামের দা নাং-এর ফিল্ড হাসপাতালে তিনি প্রতিদিন নিজের বয়সী তরুণদের ক্ষতবিক্ষত শরীর আর মৃত্যু দেখেছেন। জীবনের এই চরম নশ্বরতা তাঁকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়। হতাশায় একবার তিনি সমুদ্রে সাঁতরে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তেই এক তীব্র আত্মোপলব্ধি তাঁকে ফিরিয়ে আনে। জীবন এক মহামূল্যবান ধাঁধা, আর এর গোপন সংকেত (code) উন্মোচন করাই হবে তাঁর জীবনের লক্ষ্য। যুদ্ধফেরত ভেন্টার আর হারিয়ে যাওয়া যুবক ছিলেন না, বরং এক অপ্রতিরোধ্য জ্ঞান তৃষ্ণায় বুঁদ হয়ে পিএইচডি অর্জন করেন এবং মানুষের অস্তিত্বের মূল রহস্য সন্ধানে নেমে পড়েন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে ভেন্টার বিশ্ব মঞ্চে আবির্ভূত হন। বিলিয়ন ডলারের সেই সরকারি প্রকল্পে যখন কচ্ছপগতিতে মানুষের ডিএনএ বিন্যাস বের করার কাজ চলছিল, ভেন্টার সেই ধীরগতি মেনে নিতে পারেননি। তিনি নিয়ে এলেন ‘হোল-জিনোম শটগান সিকোয়েন্সিং’ নামক এক বিতর্কিত পদ্ধতি। প্রথাগত বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘অশুদ্ধ’ বলে উপহাস করলেও দমে যাননি তিনি। ১৯৯৮ সালে ‘সেলেরা জিনোমিক্স’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতায় নামেন, যা ইতিহাসে ‘জিনোম যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ২০০০ সালে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যখন মানব জিনোমের প্রথম খসড়া উন্মোচন করেন, ভেন্টার তখন প্রমাণ করেছিলেন যে ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং কম্পিউটেশনাল সাহস বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দিতে পারে।

আরও পড়ুন: যার ভয়ে সমুদ্রে আশ্রয় নিয়েছিল ব্রিটিশরা, সেই হাবিলদার রজব আলী নেই পাঠ্যপুস্তকে

ভেন্টারের কাছে জীবনের বই পড়াটাই যথেষ্ট ছিল না। তিনি শিখতে চেয়েছিলেন তা লিখতেও। তাঁর দর্শন ছিল, ‘ডিএনএ যদি জীবনের সফটওয়্যার হয়, তবে মানুষ তা কম্পিউটার প্রোগ্রামের মতোই লিখতে শিখবে।’ ২০১০ সালে তাঁর দল তৈরি করে ‘সিন্থিয়া’, বিশ্বের প্রথম স্ব-নকলযোগ্য কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া কোষ। একে অনেকে ‘ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ’ বলে সমালোচনা করলেও ভেন্টার ছিলেন অবিচল। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন অণুজীবের, যা জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাতাস থেকে কার্বন শুষে নেবে কিংবা মুহূর্তের মধ্যে জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি করবে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যারা জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য সংকটের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে, তাদের জন্য ভেন্টারের এই ‘প্রোগ্রামযোগ্য জীববিজ্ঞান’ আমাদের পরিবেশের শিকার নয় বরং নিজেদের অস্তিত্বের স্থপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখায়।

ভেন্টারের কৌতূহল ছিল তাঁর প্রিয় সমুদ্রের মতোই বিশাল। তাঁর গবেষণা জাহাজ ‘সোর্সারার টু’ (Sorcerer II) নিয়ে তিনি প্রায় এক লক্ষ কিলোমিটার সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়েছিলেন অণুজীব জগতের ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা রহস্যময় ডিএনএ সংগ্রহ করতে। অনেকে এই অভিযানকে চার্লস ডারউইনের ‘বিগল’ অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি সমুদ্রকে দেখতেন জেনেটিক তথ্যের এক জীবন্ত লাইব্রেরি হিসেবে, যেখানে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ জ্বালানি ও ওষুধের সমাধান।

ভেন্টার ছিলেন আপাদমস্তক স্পষ্টভাষী। তিনি প্রথম মানুষ হিসেবে নিজের সম্পূর্ণ ডিএনএ বিন্যাস প্রকাশ করে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে জিনগত সংকেত কোনো মৃত্যু পরোয়ানা নয়, বরং সম্ভাবনার এক মানচিত্র। এমনকি নিজের প্রস্টেট ক্যানসারটিও তিনি সাধারণ পরীক্ষায় নয়, বরং তাঁরই প্রতিষ্ঠানের উন্নত প্রযুক্তিতে শনাক্ত করেছিলেন। তিনি যেভাবে কাজ করতেন, সেভাবেই জীবন যাপন করেছেন, দ্রুতগতিতে, পূর্ণ প্রতিশ্রুতি নিয়ে এবং তথাকথিত ‘মানদণ্ড’কে ‘সীমানা’ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে।

আজ ভেন্টার নেই, কিন্তু তিনি আমাদের জন্য এমন এক পৃথিবী রেখে গেছেন যা তাঁর উপস্থিতিতে আমূল বদলে গেছে। জীববিজ্ঞান এখন আর শুধু পর্যবেক্ষণ নয়, বরং এটি একটি তথ্যবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিদ্যায় পরিণত হয়েছে। তাঁর দ্রুত সিকোয়েন্সিং পদ্ধতির কারণেই আমরা কোভিড-১৯ ভাইরাসকে কয়েক দিনের মধ্যে শনাক্ত করতে পেরেছিলাম। বাংলাদেশের এবং সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর জীবন এক শক্তিশালী বার্তা—অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা প্রকৃতির নিয়ম নয়, বরং আমাদের কল্পনার সীমাবদ্ধতা এবং ঐতিহ্যের বোঝা।

আরও পড়ুন: ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’—ভাষণে যা বলেছিলেন মার্টিন লুথার কিং

ভেন্টারের প্রাক্তণ স্ত্রী এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ক্লেয়ার ফ্রেজারের ভাষায়, "তিনি জিনোমিক্স এবং বায়োমেডিকেল গবেষণার গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছেন।" তাঁর উত্তরাধিকার কেবল তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রে নয়, বরং সেই কোটি কোটি মানুষের জীবনের মাঝে বেঁচে থাকবে যারা তাঁর প্রযুক্তির কল্যাণে সুস্থ হয়ে উঠবে। তিনি শিখিয়ে গেছেন যে বিজ্ঞান কেবল তথ্যের পেশা নয়, বরং এটি সাহসের এক আহ্বান।

ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীদের প্রতি তাঁর জীবনের অনুরণিত বার্তা হলো: ‘মাভেরিক’ বা বিদ্রোহী হতে ভয় পেও না, কারণ এই বিদ্রোহই উদ্ভাবনের আগুন জ্বালায়। তিনি পরবর্তী প্রজন্মকে আহ্বান করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জীববিজ্ঞানের মিলনকে আলিঙ্গন করতে। এটি কেবল যন্ত্র নয়, বরং মানব অগ্রগতির নতুন ভাষা। জে. ক্রেগ ভেন্টার প্রমাণ করেছেন যে অমরত্ব আয়ুষ্কালে নয়, বরং অর্জিত জ্ঞানের মাঝে নিহিত। সূর্যাস্ত হয়েছে এক অসাধারণ মাভেরিকের জীবনের। কিন্তু তাঁর হাত ধরে শুরু হওয়া ডিজিটাল জীববিজ্ঞানের সূর্যোদয় কেবল শুরু। তিনি আমাদের হাতে কলম তুলে দিয়েছেন, এখন বিশ্বকে সেই গল্পের পরবর্তী অধ্যায় লিখতে হবে।

অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (IBGE), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মার্কিন সিনেটে ফের নির্বাচিত হলেন কি…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
হারানোর আগেই যে পাঁচ নিয়ামতের মূল্যায়ন করতে বলেছেন রাসূল (স…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
কনটেন্ট ক্রিয়েটর মামুনের ব্ল্যাকমেইলের দর-কষাকষিতে মধ্যস্থত…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
জুলাই হত্যা মামলায় ইকবাল সোবহান গ্রেপ্তার, মুচলেকায় মুক্ত র…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
ত্বকের সাধারণ রোগ ভেবে ভুল করছেন? সোরিয়াসিস বাড়াতে পারে মান…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আজ সেন্টমার্টিনে চলাচল শুরু করেছে পর্যটকবা…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950