কলকাতায় পড়াশোনা, ঢাকায় শুরু কর্মজীবন— বহুমাত্রিক শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন কেমন ছিল

২৯ জুন ২০২৬, ০১:০৬ PM
মুস্তাফা মনোয়ার

মুস্তাফা মনোয়ার © সংগৃহীত

পাপেট- টিভি-চিত্রকলা বহু মাধ্যম নিয়ে কাজ করা একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বিষয়টি  নিশ্চিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক নিসার হোসেইন। সবশেষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ই জুন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

কেমন ছিল তার জীবন?
চারুকলায় পড়াশোনা করলেও মুস্তাফা মনোয়ার পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। কিন্তু চিত্রকলা, নির্দেশনা বা শিশুদের নানা অনুষ্ঠানের বাইরে পাপেট ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেট নিয়ে কাজ করেছেন, তৈরি করেছেন অসংখ্য নতুন অনুসারী ও গুণগ্রাহী। পড়াশোনা এবং কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও, পেশা হিসাবে মুস্তাফা মনোয়ার বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। তার বর্ণাঢ্য পেশাজীবনে তৈরি করেছেন রক্তকরবী ও মুখরা রমণী বশীকরণের মতো অসংখ্য নাটক, নতুন কুড়ি, মনের কথার মতো নানা অনুষ্ঠান। বিশেষ করে শিশুদের সহজে ছবি আঁকার জন্যে তিনি যেমন অনুষ্ঠান করেছেন, শিশুদের জন্য নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও করেছেন।

অভিনেতা রামেন্দু মজুমদার বলেন, তার সঙ্গে কাজ করা ছিলো নতুন নতুন অনেক কিছু শেখার মতো। মুস্তাফা মনোয়ার সাহেবের সাংঘাতিক একটি ক্রিয়েটিভ ক্ষমতা ছিল, সেটা তিনি ব্যবহারও করতে পারতেন। নানা বিষয়ে, যেমন তিনি গানের কথা জানেন, ছবি আঁকতে পারেন এবং অনুষ্ঠানের প্রোগ্রাম সেন্স খুব প্রখর ছিল। তিনি যে টিম তৈরি করেছিলেন, তাদের সঙ্গে মিলে দারুণ সব অনুষ্ঠান তৈরি করতে পারতেন।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তীকালে মুখরা রমণী বশীকরণ বা রক্তকরবীর মতো যেসব নাটক তৈরি করেছেন, এত ছোট জায়গার মধ্যে যে চমৎকার সেট তৈরি করেছিলেন, তা অসাধারণ।

মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ সালে। মাগুরা জেলার শ্রীপুরে তারা নানার বাড়িতে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে একজন। কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে তার পড়াশোনার হাতেখড়ি। পরে নারায়ণগঞ্জের একটি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে পড়াশোনা শেষ না করে ভর্তি হন কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে এবং ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। যদিও চিত্রকলায় তাকে কম সময় দিতেই দেখা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক নিসার হোসেইন মনে করেন, মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রকলায় সময় কম দিলেও, যেটুকু এঁকেছেন, তার গুরুত্বও অনেক। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে তিনি শ্রেষ্ঠ রেজাল্ট করে এসেছেন। তার সহপাঠীদের কাছে আমরা তার ছবি আঁকার দক্ষতার কথা শুনেছি। কিন্তু শুধু ছবি আঁকার মধ্যে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং উনি যে টেলিভিশনে গিয়েছেন, এর মাধ্যমে তিনি সেই শিল্পকলার সব মাধ্যমে অবদান রেখেছেন। শুধু চিত্রকলা দিয়ে তাঁর বিচার করলে হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে যেটুকু আমরা দেখি, চিত্রকলার ক্ষেত্রে জলরং এবং ড্রয়িং, এই দুইটি জায়গা ছিল তার বিচরণ ক্ষেত্র। সত্যি কথা বলতে গেলে, আমি মনে করি, এই দুইটি মাধ্যমে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের যে দুই-একজন উত্তরসূরির নাম করা যায়, তাদের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার একজন।’ 

মুস্তাফা মনোয়ারের অনেক ব্যতিক্রমী আর সাহসী ঘটনার একটি সাক্ষী ছিলেন তার একসময়কার সহকর্মী কেরামত মওলা। তিনি বলেন, ‌‘২৩শে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবস ছিল। তখন নিয়ম ছিল, অনুষ্ঠানের শেষে পতাকা উড়াতে হবে। সেদিন অনুষ্ঠান শেষ হবার কথা রাত ১০ টায়। টেলিভিশন স্টেশনের বাইরে আর্মি, পুলিশের লোকজন ছিল। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় আমরা অনুষ্ঠান লম্বা করে শেষ করলাম রাত ১২টার পর। এরপর পতাকা না দেখিয়েই অনুষ্ঠান শেষ করে দেয়া হয়।’

বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর শিল্পকলা একাডেমী, এফডিসি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিটিউটের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও, পাপেট ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। মুস্তাফা মনোয়ারের তৈরি করা পাপেট চরিত্র, পারুল বাংলাদেশে একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মিশুক তার পরিকল্পনাতেই তৈরি হয়েছিল।

দীর্ঘদিন মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে পাপেট নিয়ে কাজ করেছেন কামাল আহসান বিপুল। তিনি বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারকে বাংলাদেশে পাপেটের প্রবর্তক বলা যেতে পারে, যিনি সম্পূর্ণ দেশীয় ঘরানায় পাপেট তৈরি করেছেন। ‌হয়তো পাপেটের কোন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ রাত ২টার সময়, যখন তিনি ঘুমাতে যাবেন, পাপেট নিয়ে কোন চিন্তা তার মাথায় এলো। তখনি তিনি কারখানায় গিয়ে নিজেই লেড মেশিনে পাপেট তৈরি করা শুরু করে দিলেন। ভোর পর্যন্ত এভাবে কাজ করলেন। পাপেট নিয়ে এমনটাই ছিলো তার আবেগ। পাপেটের মধ্যেই সব শিল্পকলা আছে।’

তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কামাল আহসান বলেন, স্যার আমাদের দেখতে শিখিয়েছেন। তিনি মেঘ, বাতাস, প্রকৃতি দেখতে বলতেন। এভাবে সেটাকে কল্পনায় এনে নিজের মতো করে তৈরি করা শিখিয়েছেন। 

অন্যান্য কাজ থেকে অবসর নিলেও, শেষদিন পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময় সেখানেই পাপেট নিয়ে তার নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চলতো। মুস্তাফা মনোয়ার নিজে আর পাপেট তৈরি করবেন না হয়তো, কিন্তু তিনি যে পাপেটের ধারা তৈরি করে গেছেন, যাদের ভেতরে পাপেটের প্রতি আর ছবির প্রতি ভালোবাসা প্রথিত করে গেছেন, তার সেই কাজের মধ্যেই তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুয়ায়ী, মুস্তাফা মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে। এরপর একে একে কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশন থেকে ফজল-এ- খোদা রচিত ও আজাদ রহমান সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতের পরিচালনায় ছিলেন মুস্তফা মনোয়ার। 

গানটি দশজন শিল্পী গেয়েছিলেন, কিন্তু যখন গানটি প্রচারিত হয় তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল যেন কয়েকশ শিল্পী একত্রে গানটি গাইছেন। এটি সম্ভব হয়েছিল মুস্তফা মনোয়ারের অসাধারণ নির্দেশনার কারণে। কোনো গানকে একটি অনন্য শৈল্পিক রূপ দেয়ার এটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ১৯৭২ সালে বিটিভি থেকে প্রচারিত শিশু প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে জনপ্রিয় ‘নতুন কুঁড়ির’ রূপকার তিনি। ১৯৭৩ সালে মুস্তাফা মনোয়ার ‌রক্তকরবী নাটক তৈরি করেছিলেন।

নোয়াখালীতে কমিটি নিয়ে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়াতে মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি স্বাস্থ…
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬
তারুণ্যের মেধা, সমতা ও মূল্যবোধ: উচ্চশিক্ষায় নতুন প্রত্যয়
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬
২৪ ঘণ্টায় মধ্যে দেশের যেসব জেলায় বন্যা হতে পারে
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬
আন্দোলন করা সেই কওমি মাদ্রাসায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্যারোলে মুক্তি পেয়েই লাপাত্তা, এরপর সরকারি চাকরি, পেয়েছেন …
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬