মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ © টিডিসি সম্পাদিত
মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন উপমহাদেশের রাজনীতির এক বর্ণাঢ্য চরিত্র। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, কৃষক-প্রজা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি ইসলামী চিন্তা, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারেও তার অবদান রয়েছে। ১৯০০ সালে জন্ম নেওয়া এই নেতা ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
জন্ম ও শৈশব
মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার তারুটিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত পীর বংশের। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব গড়ে ওঠে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে ন্যায্যমূল্যের দাবি তুলেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষাজীবন ও তর্কবাগীশ উপাধি
তরুণ বয়সেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতিতে যুক্ত হন। খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে তিনি উত্তর ভারতের দেওবন্দসহ বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন এবং লাহোরের একটি ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অধ্যয়ন করেন।
লাহোরে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অসাধারণ বক্তৃতা ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতার জন্য তিনি তর্কবাগীশ উপাধি লাভ করেন। অর্থাৎ যুক্তি, বিতর্ক ও বক্তব্যে পারদর্শিতার কারণেই আবদুর রশীদের নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় তর্কবাগীশ পরিচয়।
সলঙ্গা আন্দোলনে নেতৃত্ব
তর্কবাগীশের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯২২ সালের সলঙ্গা আন্দোলন। খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি সলঙ্গাহাটে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ওই আন্দোলনের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেন। এ ঘটনার পর তার রাজনৈতিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়।
সলঙ্গা আন্দোলনে তার নেতৃত্বই তাকে অল্প বয়সে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করে।
কৃষক-প্রজা ও ঋণ সালিশি আন্দোলন
শুধু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নয়, কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তর্কবাগীশ সক্রিয় ছিলেন। জমিদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে তিনি কৃষক-প্রজাদের সংগঠিত করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলনের মাধ্যমে কৃষকদের ঋণের বোঝা কমাতে ঋণ সালিশি বোর্ড আইন প্রণয়নের দাবি তোলেন। ১৯৩৭ সালেও তিনি ১৪৪ ধারা অমান্য করে কৃষক সম্মেলন করেন।
১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। আইনসভায় থেকেও কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে তিনি সোচ্চার ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মাওলানা তর্কবাগীশের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। পরে তিনি মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন।
ভাষা আন্দোলনের সময় তার সংসদীয় অবস্থান ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা। পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন নিয়ে তিনি নিজেও স্মৃতিচারণ করেছেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তর্কবাগীশ
মাওলানা তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৭ সালের পর তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বের সময় শেখ মুজিবুর রহমান দলটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৭৩ সালেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের জন্য অবদান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দীর্ঘ রাজনৈতিক পটভূমি নির্মাণে তর্কবাগীশের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রতিটি পর্যায়েই তিনি সক্রিয় ছিলেন।
স্বাধীনতার পরও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। ১৯৭৬ সালে তিনি গণ আজাদী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে এর সভাপতি হন। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তার সভাপতিত্বে ১৫টি রাজনৈতিক দলের যৌথসভায় ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। এর অন্যতম নেতা হিসেবে তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষা ও ইসলামী চিন্তায় অবদান
তর্কবাগীশ শুধু রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর মাদ্রাসা শিক্ষার পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ও বাস্তবমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।
আরও দেখুন: ভূমি সংস্কার বোর্ডে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
ইসলাম ও সমাজ নিয়ে তার চিন্তা, বক্তব্য এবং লেখালেখিও তার বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।
লেখক তর্কবাগীশ
রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও করেছেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। তার রচনার মধ্যে রয়েছে—শেষ প্রেরিত নবী, সত্যার্থে ভ্রমণে, ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা, সমকালীন জীবনবোধ, স্মৃতির সৈকতে আমি এবং ইসমাইল হোসেন সিরাজী সহ বিভিন্ন গ্রন্থ।
মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৫ বছর। দেশ ও জাতির জন্য তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০০ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তরুণ নেতা থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদী কণ্ঠ, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সংগঠক থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সভাপতিত্ব—মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের জীবন ছিল প্রায় সাত দশকের রাজনৈতিক সংগ্রামের এক দীর্ঘ অধ্যায়। তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজের পক্ষে দীর্ঘদিনের সক্রিয় অবস্থান।