ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও তাঁর মাজার © টিডিসি ফটো
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশের একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলায় হলেও তাঁর কর্ম ও সাধনার প্রায় পুরো জীবন কেটেছে এ দেশের রাজধানী ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সন্নিকটে বিখ্যাত মূসা খান মসজিদ সংলগ্ন চত্বরে তাঁর মাজার অবস্থিত। বলাবাহুল্য, এই মসজিদে তিনি জুমার নামাজ আদায় করতেন। বহুদিন এ-মসজিদে তিনি ইমামতিও করেছেন।
বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি ১৯১০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজাতীয় ভাষা ‘সংস্কৃতে’ বি-এ (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় ছিল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।
সংস্কৃতজ্ঞ হিন্দু রক্ষণশীল পণ্ডিতদের একাংশ সংস্কৃত ভাষায় এম-এ শ্রেণিতে তাঁকে পাঠদানের সুযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব (কম্পারেটিভ ফিলোসোফি) বিষয়ে মনোনিবেশ করেন এবং ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এম-এ ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই ডিগ্রির অধিকারী।
পরবর্তীতে প্যারিসের বিখ্যাত শেরবোন বিশ্ববিদ্যালয় ও জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপমহাদেশের প্রাচীনতম ভাষায় রচিত চর্যাপদের ভাষা ও ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে ভাষাতত্ত্বে ‘ডি-লিট’ এবং ধ্বনিতত্ত্বে ‘ডিপ্লোমা’ ডিগ্রি অর্জন করেন। ভারতীয় মুসলমান হিসেবে ভাষাতত্ত্বে তাঁর ‘ডি-লিট’ ছিল প্রথম এবং ধ্বনিতত্ত্বে ডিপ্লোমা ছিল এশিয়ার প্রথম অর্জন। এই গবেষণাধর্মী জীবনই তাঁকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ধ্বনিবিজ্ঞানের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত করে তুলে, যার ফলশ্রুতিতে আমরা পাই তাঁর অমূল্য গ্রন্থরাজি।
১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই চব্বিশ পরগনার পেয়ারা গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মনীষীর মৃত্যু হয় ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ঢাকায় তাঁর নিজ বাসভবন ‘পেয়ারা ভবনে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল সংলগ্ন মূসা খান মসজিদের পাশে কবরস্থ করা হয়।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আমরা সাধারণত একজন ভাষাতত্ত্ববিদ ও মহান শিক্ষাবিদ হিসেবে জানি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তিনি যে একজন আপসহীন বিপ্লবী ভাষাসৈনিক ছিলেন- সে কথা প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। ভাষা আন্দোলনে তাঁর মতো প্রাজ্ঞ, সাহসী ও দূরদর্শী সিপাহী আর একজনও ছিল না; এমনকি আজও নেই।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে যে সংকট তৈরি হয়, সেখানে ডক্টর শহীদুল্লাহ দৃঢ় কণ্ঠে বাংলার পক্ষে অবস্থান নেন। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা- এ কথা উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার যে চেষ্টা চলছিল, তিনি তার তীব্র বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন পাকিস্তান শুধু মুসলমানদের দেশ নয়; এখানে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মাতৃভাষার দাবিও সমানভাবে মর্যাদার দাবি রাখে।
তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে যুক্তি দেন- ইসলাম মাতৃভাষার পক্ষেই কথা বলে, কোন নির্দিষ্ট ভাষার নয়। তাঁর ভাষায়, ‘উর্দু বাংলার দখল উত্যক্তে কিছুতেই খাস দখল পাইতে পারে না; দখল বাংলারই থাকিবে।’ তবে তিনি কখনো উর্দু ভাষার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। বরং পাকিস্তানের আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগের প্রয়োজনে উর্দুর ভূমিকা স্বীকার করে উর্দু ও বাংলাকে সমান রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
ভাষা বিষয়ে তাঁর এই সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান কোন আবেগপ্রসূত রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; বরং আজীবন গবেষণা, তুলনা ও বিশ্লেষণের ফসল। ১৯২০ সালেই বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতনে ‘ভারতের সাধারণ ভাষা’ প্রসঙ্গে তিনি উর্দু, বাংলা ও হিন্দির যৌক্তিক দাবির কথা তুলেছিলেন। পরবর্তীকালে ইতিহাসের ধারায় তাঁর সেই প্রস্তাবই বাস্তবতায় রূপ নেয় উর্দু, বাংলা ও হিন্দি তিনটি ভাষাই তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমাণ করে গেছেন ভাষা কোন ধর্মীয় বা সংখ্যার জোরে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের মৌলিক অধিকার। ভাষাতত্ত্ববিদ, শিক্ষাবিদ ও ভাষাসৈনিক এই তিন পরিচয়ের সম্মিলনেই তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য মহীরুহ।
পরিশেষে উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাঁর ১৪০ তম জন্মবার্ষিকী আসন্ন।