ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন © টিডিসি সম্পাদিত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন (আবু নছর মুহাম্মদ এহসানুল হক মিলন)। গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে জাতীয় সংসদ ভবনে হাই জাম্প দিয়ে ঢুকে আলোচনায় আসেন তিনি। পরে শিক্ষা প্রশাসনের দুই মন্ত্রণালয়ের (শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা) দায়িত্ব পেয়ে কাজও শুরু করেছেন সেই লাফের গতিতে। দায়িত্ব নেওয়ার দিন গত বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) তিনি নিজেই বলেছেন, দেশের শিক্ষাখাতে শুধু ‘হাই জাম্প’ দিলেই হবে না, দিতে হবে ‘পোল ভল্ট জাম্প’।
জানা গেছে, দুই দশক পর ফের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। প্রতিমন্ত্রী নয়, এবার পেলেন শিক্ষা প্রশাসনের দুই মন্ত্রণালয়ের (শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা) পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব। ২০০১-০৬ সালে খালেদা জিয়া সরকারের সময় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নকল দূরীকরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন সেই সময়কার শিক্ষার এই প্রতিমন্ত্রী। তখন হেলিকপ্টার নিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে পরীক্ষায় নকল নিয়ন্ত্রণের মধ্যদিয়ে আলোচনায় আসেন ড. মিলন। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভ্যানিটি ব্যাগ চুরির মতো হাস্যকর মামলার আসামি হিসেবেও বেশ আলোচিত তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও দেশের শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ দায়িত্বে ফিরেছেন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শিক্ষাখাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছেন তিনি। গত বুধবার সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন নতুন এই শিক্ষামন্ত্রী। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দসহ ১২টি উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে আরেকটি সংবাদ সম্মেলনে।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর থেকে বিপুল ব্যবধানে নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় জায়গা পান মিলন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি দেশের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তখনকার দিনে পরীক্ষায় গণনকলের যে মহোৎসব চলত, তা রুখতে তিনি প্রটোকল ছাড়াই হেলিকপ্টারে চড়ে আকস্মিক অভিযানে নামতেন। এক বোর্ড থেকে অন্য বোর্ডে তার এই অতর্কিত পরিদর্শনের কারণে পরীক্ষাকেন্দ্রে শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং ‘নকলমুক্ত’ শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন এক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার এই প্রশাসনিক সংস্কার আজও দেশের শিক্ষা খাতের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। পাশাপাশি সেসময় শিক্ষার দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও তিনি আলোচিত ছিলেন।
জানা যায়, তৎকালীন তার এই উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা এবং শিক্ষকরা ক্লাসরুম মুখী হতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি নকল প্রতিরোধ করার জন্য যে হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছিলেন তার সরকারের খরচে ছিল না। এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি টেনে ড. মিলন বলেছিলেন, তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং হেলিকপ্টার কোম্পানির মালিক সেটা তাকে দিয়েছিলেন এই কঠোর মনিটরিং করার জন্য। সে কারণে ওই সময় সময় পাবলিক পরীক্ষার পাশের হার বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল, যা শিক্ষার প্রকৃত মান ও মেধা যাচাই নিশ্চিত করতো বলে মনে করছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
‘হেলিকপ্টার মিলন’ হিসেবেও পরিচিতি নতুন শিক্ষামন্ত্রী
প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ড. মিলন পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় আসেন। এসএসসি ও এইচএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার সময় তিনি আকস্মিকভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হতেন, কখনো নিজ হাতে নকল ধরতেন। এজন্য তিনি ‘হেলিকপ্টার মিলন’ হিসেবেও বেশ পরিচিতি
এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে দ্রুত যেতে তিনি নিজ অর্থে ভাড়া করা হেলিকপ্টার ব্যবহার করতেন। এ কারণেই অনেকে তাকে ‘হেলিকপ্টার মিলন’ নামে ডাকতেন। তার কঠোর অবস্থানের ফলে সে সময় পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত গড় পাসের হার ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশের কিছু বেশি। তবে তার কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল।
আ ন ম এহসানুল হক মিলনের জন্ম ১৯৫৭ সালের ২৬ মার্চ চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলায়। তিনি শের ই বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং গভ. ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমান সরকারী বিজ্ঞান কলেজ) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক পাস করে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ব্রুকলিন কলেজ এবং বোরো অফ ম্যানহাটন কমিউনিটি কলেজে সহকারী প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং কর্মজীবনে ঔষধ শিল্পে রসায়নবিদ হিসেবে কাজ করেন। ২০১৮ সালে তিনি মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার গবেষণাপত্রের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ভূমিকা।
আ ন ম এহসানুল হক মিলন ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে। তিনি ইতঃপূর্বে ২ বার সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে এহসানুল হক মিলন সারা দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে পরীক্ষায় নকল বিরোধী নানান তৎপরতার কারণে সারাদেশে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি।
এহসানুল হক মিলন চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসন থেকে প্রথম ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তারপর ২০০১ সালে তিনি বিপুল ব্যবধানে হারিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীরকে। যার পরিণতি হিসেবে মহিউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে মামলার বোঝা চাপানো হয় মিলনের ঘাড়ে। হত্যা ও চেষ্টা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, চাঁদাবাজি এবং ছিনতাইসহ অর্ধ শতাধিক মামলার আসামি করা হয় তাকে। সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীকে অপদস্থ করতে দেওয়া হয় মহিলাদের ভ্যানিটি ব্যাগ চুরির মামলাও।