ভুলে যাওয়া বাঙালি বিচারক, জাপানের চিরস্মরণীয় বীর

১২ মে ২০২৬, ০৬:১০ PM , আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ০৬:১৭ PM
জাপানের চিরস্মরণীয় বীর বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল

জাপানের চিরস্মরণীয় বীর বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল © সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের অবদান আন্তর্জাতিক পরিসরে গভীরভাবে স্বীকৃত হলেও নিজেদের দেশে তারা প্রায় বিস্মিত। বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন।

কুষ্টিয়ার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি আইনবিদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এমন এক নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যা আজও বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। অথচ পরিতাপের বিষয়- বাংলাদেশে তাঁর নাম আজও যথার্থ গুরুত্ব পায় না, যেখানে জাপানে তিনি সম্মানিত একজন বীর।

১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ - এই সময়কালে অনুষ্ঠিত ‘টোকিও ট্রায়াল’ বা International Military Tribunal for the Far East ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের যুদ্ধাপরাধের বিচার। ১১ জন বিচারকের এই ট্রাইব্যুনালে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকরা জাপানের শীর্ষ নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করেন। কিন্তু এই একমুখী সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন একমাত্র বিচারক - রাধা বিনোদ পাল।

তিনি তাঁর প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার বিশাল রায়ে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, এই বিচার মূলত “বিজেতার ন্যায়বিচার”। তাঁর যুক্তি ছিল - যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডকে পরবর্তীতে নতুন আইনের আওতায় এনে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা ন্যায়সংগত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচারপ্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতার অভাব ছিল প্রকট, বিশেষত জাপানের সম্রাট হিরোহিতোকে বিচারের বাইরে রাখা এই ট্রায়ালের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাধা বিনোদ পালের অবস্থান শুধুমাত্র আইনি ছিল না; এটি ছিল গভীরভাবে নৈতিক ও রাজনৈতিক। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন - যে শক্তিগুলো নিজেরাই উপনিবেশ স্থাপন, যুদ্ধ ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত, তারা কীভাবে অন্যদের বিচার করার নৈতিক অধিকার রাখে?

তিনি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে নৃশংস অপরাধগুলোর একটি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, যদি জাপানের কর্মকাণ্ড অপরাধ হয়, তবে মিত্রশক্তির কর্মকাণ্ডও একই মানদণ্ডে বিচার হওয়া উচিত।

May be a black-and-white image

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - তিনি জাপানের সব কর্মকাণ্ড অস্বীকার করেননি। নানজিং গণহত্যার মতো ঘটনাকে তিনি স্বীকার করেছেন, কিন্তু সেগুলোকে ‘Class B’ ও ‘Class C’ অপরাধ হিসেবে বিচার করার পক্ষে ছিলেন। অর্থাৎ, তাঁর আপত্তি ছিল বিচারপ্রক্রিয়ার কাঠামো ও ন্যায়বিচারের ধারণা নিয়ে, অপরাধের অস্তিত্ব নিয়ে নয়।

রাধা বিনোদ পালের চিন্তাধারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী মনোভাব দ্বারা। তিনি এশিয়ার ইতিহাসকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন এবং দেখান যে, জাপানের উত্থান ও কর্মকাণ্ডকে সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক আইনশাস্ত্রে Third World Approaches to International Law (TWAIL) ধারার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, তিনি শুধু একজন বিচারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি বিকল্প বৈশ্বিক চিন্তার অগ্রদূত।

No photo description available.

আজও জাপানে রাধা বিনোদ পাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। টোকিও ও কিয়োটোতে তাঁর নামে সড়ক, জাদুঘর ও স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। ইয়াসুকুনি শ্রাইনে তাঁর স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে - যা কোনো বিদেশির জন্য বিরল সম্মান। জাপানের সম্রাট হিরোহিতো তাঁকে “Order of the Sacred Treasure” সম্মানে ভূষিত করেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে তাঁর স্মৃতি অনেকাংশেই উপেক্ষিত। শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর অবদান যথেষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়; জনপরিসরেও তাঁর নাম প্রায় অনুচ্চারিত। এই বৈপরীত্য আমাদের ঐতিহাসিক সচেতনতার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে।

রাধা বিনোদ পালের রায় নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সমালোচকদের মতে, তাঁর অবস্থান জাপানের যুদ্ধাপরাধকে আংশিকভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে। আবার সমর্থকদের মতে, তিনি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলো - আইনের বৈধতা, নিরপেক্ষতা ও সার্বভৌমত্ব - রক্ষা করেছেন।

বাস্তবতা হলো, তাঁর উত্তরাধিকার জটিল ও বহুমাত্রিক। তাঁকে একপাক্ষিকভাবে বিচার করলে তাঁর চিন্তার গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

রাধা বিনোদ পালের জীবন ও কর্ম আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয় - ন্যায়বিচার কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয় নয়; এটি বিবেক, যুক্তি ও সাহসের বিষয়। তিনি দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপের মধ্যেও একজন ব্যক্তি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন।

No photo description available.

আজ যখন বিশ্বে ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, তখন রাধা বিনোদ পালের চিন্তাধারা পুনরায় মূল্যায়নের দাবি রাখে। বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব - এই মহান ব্যক্তিত্বকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করা, তাঁর চিন্তাকে আলোচনায় আনা এবং ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায় পূরণ করা।

কারণ, যে জাতি তার বীরদের ভুলে যায়, সে জাতি নিজেই তার ইতিহাস হারায়।

মোঃ আইমান মাহমুদ
শিক্ষার্থী, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সবচেয়ে বেশি ছুটি খান ঢাবি শিক্ষার্থীরা, দ্বিতীয়  কলেজ, তৃতী…
  • ০১ জুন ২০২৬
খানজাহান আলী মাজারের দিঘিতে এক শিশুকে টেনে নিয়ে গেছে কুমির
  • ০১ জুন ২০২৬
বিলে নৌকাডুবিতে নারীসহ শিশুর মৃত্যু
  • ০১ জুন ২০২৬
মে মাসে হামলা-মামলা ও জীবননাশের হুমকির শিকার ৫৫ সংবাদকর্মী
  • ০১ জুন ২০২৬
দুই সিটির সেই দুই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত
  • ০১ জুন ২০২৬
যশোরের মণিরামপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই বন্ধুই ছিলেন পরিবা…
  • ০১ জুন ২০২৬