টাকা-পয়সা উপার্জন করতে মানুষ ব্যবসা, চাকরি, রাজনীতি—কত কী করে। আবার ভালোবাসার টানে, ভালো কাজ করতে গিয়ে অনেকে বিসর্জন দেন নিজের সব কিছু। ঠিক এমন একজন মানুষ রংপুর মহানগরীর বুড়িরহাট বাহাদুর সিংহ এলাকার সহিদার রহমান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় কত কিছুই না করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত টানা ২০ বছর কাফনের কাপড় পরে দেশজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। দাফনের আগে বঙ্গবন্ধুকে ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করানো হয়েছিল। ওই সাবান দিয়ে গোসল করেন সহিদার রহমান। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্বাস্থ্য কামনায় গত ৩০ বছর প্রতি কোরবানির ঈদে পশু কোরবানি দেন।
মুক্তিযোদ্ধা (গেজেট নম্বর ৭৬৩, তারিখ ২৩/০৫/২০০৫, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর ০৩১৩০৪০০২১, তারিখ ২৭/০৯/২০১১, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ভারতীয় নম্বর ৪১৩৮৩) সহিদার রহমান অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী। বর্তমানে তিনি পল্লী চিকিৎসক। এ কারণে এলাকায় ডা. সহিদার নামে পরিচিত তিনি। ছোটবেলা থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত। যেখানেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কিংবা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনা, সেখানেই হাজির তিনি। কথায়, পোশাকে, চলনে-বলনে যে কেউ তাঁকে দেখলেই বুঝতে পারেন তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯০ সালের ১৫ আগস্ট সহিদার শরীরে তুলে নেন কাফনের কাপড়। এই কাফনের কাপড় পরে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তাঁর কোমরের বেল্টে লাল অক্ষরে লেখা ছিল ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের যতদিন ফাঁসি না হবে ততদিন কাফনের কাপড় পরিধান করিয়া থাকিব।’ ২০ বছর পর ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের দিন তিনি শরীর থেকে কাফনের কাপড় নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলেন। এরপর ওই দিনই গায়ে তুলে নেন ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবিসংবলিত গেঞ্জি; যার সামনের অংশে লেখা ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর কর-করতে হবে’। অন্য অংশে লেখা ছিল ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই-করতে হবে’। ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার সংবাদ রাতভর ঘরে বসে টেলিভিশনে দেখেন সহিদার রহমান। পরদিন সকালে রংপুর শহরে সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের আনন্দ মিছিলে যোগ দেন তিনি। সেখানেই দাবিসংবলিত গায়ের গেঞ্জিটি খুলে পুড়িয়ে দেন। ওই সময় সহিদার বলেছিলেন, ‘এ্যালা মুই মরিয়াও শান্তি পাইম।’
গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতরে পৈতৃক ভিটা থাকলেও রংপুর নগরীর বুড়িরহাট বাহাদুর সিংহ এলাকায় বাস করেন সহিদার রহমান। সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে তাঁর। সহিদারের স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুভক্ত সহিদার পুরো জীবন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাইকে নিজের পরিবারের সদস্য বলে তাঁর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এ নিয়ে নানান জনের কটূক্তির পরও তিনি দমে যাননি। বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে চলছেন জীবনভর।’
বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতি সহিদারের ভালোবাসা দেখে রংপুর সদরের পরশুরাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। গঙ্গাচড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও গঙ্গাচড়া আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমীন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুপাগল সহিদার রহমান অভাব-অনটনের মধ্যেও কখনো দমেননি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিরল শ্রদ্ধা-ভালোবাসার নজির স্থাপন করেছেন তিনি।’
১৯৯০ সালে ঈদুল আজহার দিন প্রথম শেখ হাসিনার সুস্বাস্থ্য কামনা করে গরু কোরবানি দেন সহিদার। ওই সময় তিনি শপথ নেন, যত দিন বেঁচে থাকবেন তত দিন প্রতি ঈদুল আজহায় শেখ হাসিনার নামে গরু কোরবানি দেবেন। সেই থেকে ৩০ বছর ধরে কোরবানি দিয়ে আসছেন তিনি।
তাঁর আরেকটি শপথ হলো বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমৃত্যু ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করবেন তিনি। আর পরিবারের সদস্যদের বলে দেওয়া আছে, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে দাফন করা হয়।
সুত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ